ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে সম্মত হবে এবং সরকার রাষ্ট্রপতিকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর ব্যত্যয় হলে মাঠেই এর সমাধান হবে।
বুধবার (১১ মার্চ) সন্ধায় রংপুর শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়ামে বিভাগীয় ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ইফতার মাহফিলে আরো বক্তব্য রাখেন- এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আাতিক মুজাহিদ এমপি, উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক-উত্তরাঞ্চল আসাদুল্লাহ আল গালিব, জাতীয় যুব শক্তির আহবায়ক তরিকুল ইসলাম,
কেন্দ্রীয় দফতর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মাহফুজ উন নবী ডন, মহানগর জামায়াত সেক্রেটারি আনোয়ারুল ইসলাম কাজল প্রমুখ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘রংপুরে নতুন একটি বিজয়ের সূচনা হয়েছে সেটা কি আপনারা টের পেয়েছেন? সেটা হলো আওয়ামী লীগের যে দোসর ছিল জাতীয় পার্টি সেটা রংপুর থেকে ওয়াশ আউট হয়ে গিয়েছে।’
নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী আরো বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের খুব সংকটের মুহূর্তে যাচ্ছি। আগামীকাল সংসদ অধিবেশন শুরু হচ্ছে। আগামীকাল বাংলাদেশে সিদ্ধান্ত হবে বাংলাদেশ কি গণতন্ত্রের পক্ষে যাবে নাকি স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে যাবে? যদি আগামীকাল বাংলাদেশ স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে যায় আমাদেরকে আরেকটি বিপ্লবের প্রস্তুতি রাখতে হবে ইনশাআল্লাহ।’
পাটোয়ারী আরো বলেন, ‘আমরা অনেক ভুল করেছি। আমরা অনেকের প্রতি দয়া দেখিয়েছি। অনেকের প্রতি মায়া দেখিয়েছি। অনেকের প্রতি সহনশীল আচরণ করেছি। ভদ্র ব্যবহার করেছি। সভ্য সমাজের সূচনা করেছি। কিন্তু আমাদের যে দুর্বলতাকে আপনারা নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন চুপচুপ যে ভাষণ সংসদে বাজানোর প্রচেষ্টা করছেন, আওয়ামী লীগের অফিস খোলার চেষ্টা করছেন, এই সকল পায়তারা যদি চালনা আপনারা রাখেন তাহলে আপনাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ অবতীর্ণ হতে হবে ইনশাআল্লাহ ‘
অনুষ্ঠানে এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন,‘আগামীকালকে বারোই ফেব্রুয়ারি। এই বারো তারিখে, কালকে নতুন করে জাতীয় সংসদ বসতে যাচ্ছে। আমাদের যারা শহীদ পরিবার আছেন, আমাদের যারা জুলাইয়ের যোদ্ধা আছেন, আমাদের যারা রাজপথে সহযোদ্ধা আছেন, আগামীকালকে আপনারা ওই জাতীয় সংসদের সামনে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করবেন। কারণ, ওই জাতীয় সংসদে আগামীকালকে থেকে হয় স্বৈরাচারের দিকে মানুষ এই জাতীয় সংসদকে নেয়ার চেষ্টা করবে, কিংবা ওই সংসদে যারা আছে তারা বাংলাদেশকে সঠিক পথে নেয়ার চেষ্টা করবে।’
সারজিস আলম বলেন, ‘মনে রাখতে হবে আমাদের এই ভোট, আমাদের এই জীবন, আমাদের এই আমানত রক্ত, এত কিছুর বিনিময়ে নতুন যে বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশে এই সরকার যেন নতুন করে আমাদের এই সংসদকে, আমাদের এই এমপি মন্ত্রীদেরকে নতুন কোন স্বৈরাচারের পথে না নিতে পারে। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই কিনা? আমরা সংস্কার চাই কিনা? আমরা সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ চাই কিনা? তাহলে আমাদেরকে ওই সংসদকে, ওই এমপি মন্ত্রীদেরকে সঠিক পথে রাখার জন্য আজকে থেকে নতুন করে আবার রাজপথে থেকে তাদেরকে সঠিক লাইনে রাখতে হবে।’
অনুষ্ঠানে এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা চব্বিশের আগে পর্যন্ত ফ্যাসিবাদকে আমরা মোকাবেলা করেছি। কিন্তু চব্বিশে নির্বাচনের পরে আমাদেরকে প্রতারণাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কারণ এমন একটা সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এমন একটা দল ক্ষমতায় এসেছে সেই বিএনপির সাথে চব্বিশের পাঁচ আগস্ট পর্যন্ত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই রাজপথে আমরা আন্দোলন করেছি। একসাথে আমরা রক্তাক্ত হয়েছি। একই সাথে আমরা জেল খেটেছি। একই সাথে আমরা রাজপথের সিদ্ধান্তগুলো আমরা গ্রহণ করেছি। সেই বিএনপি চব্বিশে নির্বাচনের পরে প্রতারণার আশ্রয় যখন নেয় তখন আমাদেরকে ভাবতে হয় বিএনপির এমপিরা যারা আছেন তারা ইতিমধ্যে তারা বাংলাদেশের আইন ভঙ্গ করেছেন।’
আখতার বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন যে আদেশ সে আদেশ বিএনপি লঙ্ঘন করেছেন। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির এমপিরা বাংলাদেশের আইন লঙ্ঘন করার কাজটা তারা শুরু করেছেন। সেই সংবিধান সংস্কারের জন্য যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার জন্য যে আদেশ জারি করা হয়েছে, সে আদেশের মধ্যেই বলা আছে সংসদ যেমন করে ত্রিশ দিনের মধ্যে বসতে হবে, তেমন করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভাও তিরিশ দিনের মধ্যে বসতে হবে। কিন্তু যে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন, তারই উচিত ছিল সংস্কার পরিষদের জন্য অধিবেশন আহ্বান করা। বিএনপি সরকারি দল। তাদের উচিত ছিল সেজন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই।’
এনসিপি আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আগামীকাল বারোই মার্চ পুরো সারা বাংলাদেশের মানুষ, পুরো বিশ্ববাসী অপেক্ষা করে আছে নতুন সংসদ অধিবেশনের জন্য। হাজারো মানুষের রক্তের উপর দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন, গণভোট এবং এই নতুন সরকার এবং নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। ফলে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে শুধু প্রত্যাশা নয়, আমাদের দাবি এবং আমরা অবশ্যই সেটা আদায় করে ছাড়বো। সেটা হচ্ছে সংস্কারের দাবি, সংবিধান সংস্কার পরিষদের দাবি, উচ্চ পক্ষের দাবি এবং নতুন বাংলাদেশের দাবি। ’
নাহিদ বলেন, ‘আগামী দিন থেকে শুরু হবে সেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের যাত্রা। আমরা আশা করছি সরকার দল শপথ নিতে সম্মত হবে এবং যে পুরনো রাষ্ট্রপতি, সেই রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন শুরু করা হবে, উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’
নাহিদ আরো বলেন, ‘যদি এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে, আপনারা সবই দেখছেন, সবই বুঝেন, সবই জানেন। কারা এর জন্য দায়ী। কারা বাধাগ্রস্ত তৈরি করবে, বাধা তৈরি করবে। আপনারা সেগুলো দেখবেন। আপনাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা যার যার জায়গা থেকে সোচ্চার হবেন। এটা কোন দল বা মতের বিষয় নয়। সংস্কার সকলের জন্যই প্রযোজ্য। ’
আখতার বলেন, ‘আপনারা সবাই হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন না? আমরা এবারের গণভোটে কিসের পক্ষে ভোট দিয়েছি? আমরা হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দিয়েছি দল মত নির্বিশেষে। ফলে সেই হ্যাঁকে কার্যকর করা এই সংসদের অন্যতম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য আমরা যাচ্ছি। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য, ঋণখেলাপিমুক্ত করার জন্য, চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসকে মুক্ত করার জন্য আমরা সংসদে যাচ্ছি।’
ইফতার মাহফিলে স্থাণীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিএনপি জামায়াতসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
সাংবাদিকদের ইফতার বর্জন: এদিকে পূর্ব মুহুর্তেও ইফতার সামগ্রী না দেয়ায় শতাধিক গণমাধ্যমকর্মী ইফতার না করেই অনুষ্ঠাস্থল ত্যাগ করেন।
সংঘর্ষ: ইফতারের আগে স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিয়ে জাতীয় ছাত্র শক্তি ও যুবশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি হয়। ইফতারের পর এই মারামারি সংঘর্ষে রুপ নেয়। এক পর্যায়ে শুরু হয় ধাওয়া পাল্টিা ধাওয়া। এতে উভয়পক্ষের ৫ জন আহত হয়। ৩ জনকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাত ৯ টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় সার্কিট হাউজে ঘটনাটি সমঝোতার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ চেষ্টা চালাচ্ছেন।



