কুড়িগ্রাম জেলার তিনটি সীমান্ত দিয়ে চলতি মাসের বিভিন্ন সময়ে ৩০ জন রোহিঙ্গাসহ ৪৪ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ।
এর মধ্যে রৌমারী সীমান্ত পথে ভারতে অবস্থান করা ২১ জন রোহিঙ্গা ও ৯ জন বাংলাদেশীকে পুশ ইন করা হয়েছে। ৬ মে গভীর রাতে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে তাদের পুশ ইন করে বিএসএফ। পরে তাদের আটক করে বিজিবি ও রৌমারী থানা পুলিশ।
জামালপুর বিজিবি-৩৫ ব্যাটালিয়নের রৌমারী ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার সোহেল রানা রোহিঙ্গাসহ ৩০ জন আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রৌমারী বিজিবি ও সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে, ভারতের আসাম রাজ্যের দক্ষিণ সালমারা মানকারচর জেলার শাহপাড়া বিএসএফ সদস্যরা ৬ মে রাতে ২১ জন রোহিঙ্গাসহ ৩০ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশ ইন করে। তাদের মধ্যে বিজিবির টহল দল ২৭ জনকে আটক করে। এ ছাড়াও রৌমারী থানা পুলিশ উপজেলার কর্তিমারী এলাকা থেকে তিনজনকে আটক করে।
আটককৃতদের বিজিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আটক রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী নাগরিকরা ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ভারতের আসাম রাজ্যের গোহাটি লকড়া সেন্ট্রাল কারাগারে আটক ছিলেন। পরে তাদের আসাম রাজ্যের গোয়ালপাড়া মাটিয়াল ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক রেখে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ কেড়ে নেয়া হয়। ৬ মে দক্ষিণ শালমারা মাইনকারচর শাহপাড়া বিএসএফ রাতের আঁধারে তাদের বাংলাদেশে পুশ ইন করে।
জামালপুর বিজিবি-৩৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘আমরা আটককৃতদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করছি।’
অন্যদিকে, জেলার ভূরুঙ্গামারীর ভাওয়ালকুড়ি সীমান্তপথে ভারতে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা নারী ও শিশুসহ ১৪ রোহিঙ্গা নাগরিককে আটক করেছে বিজিবি। তারা সবাই কক্সবাজার উখিয়া ক্যাম্প থেকে দালালদের সহায়তায় ভূরুঙ্গামারীর ভাওয়ালকুড়ি বাজারের কাছে জড়ো হয়েছিলেন বলে জানিয়েছে বিজিবি।
কুড়িগ্রাম বিজিবি ২২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুব উল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, তারা দালালের মাধ্যমে উখিয়া থেকে ভূরুঙ্গামারী সীমান্তে এসেছে। তাদের উন্নত দেশে পাঠানোর কথা বলে দালালরা এখানো নিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে। পরে তাদের ফেলে দালালরা পালিয়েছে।’
আটকৃতদের মধ্যে রৌমারী সীমান্তে ৩০ জন ও ভূরুঙ্গামারী সীমান্তে ১৪ জন ৭ মে ভোররাতে রৌমারী উপজেলা বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ভাওয়ারকুরি সীমান্তে দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ঘোরাঘুরির সময় স্থানীয়রা তাদের আটক করে বিজিবি’র হাতে তুলে দেয়।
৭ মে সকালে আটককৃতরা সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন বাজারে ঘোরাঘুরির সময় তাদের কথাবার্তা সন্দেহজনক হলে তাদের আটক করার কথা জানায় স্থানীয়রা।
রৌমারী থানার ওসি লুৎফর রহমান জানান, ভোররাতে রৌমারী বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ৩০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এদের মধ্যে ২২ জন রোহিঙ্গা। আটককৃতদের পরিচয় যাচাই করছে বিজিবি।
কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবি ব্যাটারিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মোহাম্মদ মাহবুব উল হক জানান, ভূরুঙ্গামারীর ভাওয়ালকুরি সীমান্ত এলাকায় ৮ নারী শিশুসহ ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তারা সবাই রোহিঙ্গা।
জামালপুর বিজিবি সূত্র জানায়, রৌমারীতে আটককৃতদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশী। আর বাকিদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অপরদিকে ফুলবাড়িতে কাজের সন্ধানে ভারতের দিল্লিতে গিয়ে দেশে ফেরার সময় বিএসএফের হাতে আটক ২৪ জন বাংলাদেশী নারী, পুরুষ ও শিশুকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত এনে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
গত ২৩ মে রাত ১টা ৩০ মিনিটে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বালাতাড়ী সীমান্তের ৯৩২ নম্বর সীমানা পিলারের পাশে বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে বিএসএফ আটককৃত ২৪ জন বাংলাদেশীকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিজিবি তাদের বালারহাট ক্যাম্পে নিয়ে আসে এবং যাচাই-বাছাই শেষে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
এরপর বিএসএফ ২৪ জনের একটি তালিকা বিজিবিকে দেয়, যা যাচাই-বাছাই শেষে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। ফেরত আসা ২৪ জনের মধ্যে রয়েছে ১২ জন পুরুষ, ১২ জন নারী ও শিশু।
তারা হলেন- ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া সমন্বয়টারী গ্রামের তাজুল ইসলাম (২৫), তার স্ত্রী আম্বিয়া বেগম (১৯), মেয়ে তাসলিমা (৭), মাতা তানেকা বেগম (৪৬), বোন তাহেরা খাতুন (৭); দাসিয়ারছড়া কামালপুর গ্রামের মানব আলী (২৩) ও স্ত্রী রুমি বেগম (২০); একই গ্রামের আব্দুল কাদের (৩১), স্ত্রী সাথী বেগম (২৮), ছেলে শহিদুল (৯), মেয়ে কাজলী (২); আরাজী নেওয়াশী গ্রামের জায়দুল হক (৫৫), স্ত্রী আঞ্জুমা বেগম (৪৩), ছেলে আশিক বাবু (১৪), মেয়ে জান্নাতি খাতুন (১৯), জামাতা রবিউল (২২), ১০ মাস বয়সী নাতি জুনায়েদ; ভাঙ্গামোড় বটতলা গ্রামের হাসেন আলী (৩৫), স্ত্রী আলমিনা বেগম (২৯), মেয়ে হাছিনা (১৩), ছেলে আরিফ (৪), আরমান (২); এবং নাগেশ্বরী উপজেলার গোপালপুর গ্রামের আব্দুস ছালাম (৫০)।
লালমনিরহাট বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর হাসনাইন জানান, ‘বিজিবি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিএসএফের সাথে পতাকা বৈঠক করে ২৪ বাংলাদেশী নাগরিককে ফেরত নিয়েছে। এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।



