পটুয়াখালীর কলাপাড়ার তরমুজের খ্যাতি দেশজুড়ে। উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎপাদিত এ ফসল একসময় জেলার কৃষকদের জন্য ব্যাপক লাভজনক ছিল। দরপতন ও পাইকার সঙ্কটের ফলে লোকসানের শঙ্কায় বিপাকে পড়েছেন তরমুজ চাষিরা।
বিক্রি না হওয়া তরমুজ মাঠে ও মোকামে পড়ে থাকায় হাজারো চাষি চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। ঈদের আগে ও পরে কয়েক দফা বৃষ্টিতে কাদাময় হয়ে গেছে তরমুজের ক্ষেত। কাদায় নষ্ট হচ্ছে পাকা তরমুজ। রোজার শুরুতে কিছু চাহিদা থাকলেও এখন বাজার প্রায় স্থবির।
কৃষকদের মতে, উৎপাদনের ঝুঁকি, বাজার দরে অস্থিরতা, সেচ সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মিলিয়ে তরমুজ চাষে এখন লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি। এক সময় যে তরমুজ উপকূলের অর্থনীতিতে গতি এনেছিল, সেটিই এখন অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু টানা কয়েক বছরের লোকসানে এবার অঞ্চলটিতে তরমুজ আবাদে বড় ধস নেমেছে। অনেক কৃষক ঝুঁকি এড়াতে আবাদ কমিয়েছেন, কেউ কেউ একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন।
লালুয়া চরচান্দুপাড়া গ্রামের কৃষক ফেরদৌস তালুকদার এ বছর ৬৪ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ আবাদ করেন। এতে এখন পর্যন্ত তার প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলন মোটামুটি ভালো হলেও দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। ঈদের দুই দিন আগে বিক্রি শুরু করে এক চালানে মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছেন, অথচ এক গাড়ি তরমুজে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। পরের চার গাড়ি তরমুজ এখনো বিক্রি হয়নি। নতুন করে পাঠানো চার গাড়ি তরমুজ বিক্রিও অনিশ্চিত।
ভুক্তভোগী কৃষক ফেরদৌস তালুকদার জানান, গত বছর যেখানে দুই গাড়ি তরমুজ প্রায় নয় লাখ টাকা বিক্রি করেছিলেন, সেখানে এবার দুই লাখ টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। দুই হাজার ২০০ টাকা মণ দরের তরমুজ বাধ্য হয়ে এখন এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকার না আসা ও মোকামে চাহিদা কমে যাওয়ায় এ বছর অন্তত ১২ লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।
নয়াকাটা গ্রামের কামাল হাওলাদার ২৪ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। দুইজন শ্রমিক নিয়ে শুরু থেকে মাঠে কাজ করছেন তিনি। ফলন ভালো হলেও দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে তাকেও গুণতে হবে লোকসান।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, যারা আগাম ফলন পেয়েছেন ও রমজানের মধ্যে বিক্রি করতে পেরেছেন, তারা কিছুটা লাভবান হয়েছেন। বাকি চাষীরা এখন লোকসানের শঙ্কায় দিশেহারা। তার ওপর কয়েকশ কৃষকের ক্ষেতে আশানুরূপ ফলনও হয়নি।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কলাপাড়ায় চার হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এ আবাদের সাথে প্রায় তিন হাজার চাষি যুক্ত রয়েছেন। এবার উপজেলায় প্রায় ৪০৪ কোটি টাকার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্ধেক কৃষক লোকসানে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো: নাহিদ হাসান জানান, গত বছর তিন হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ৪০ টন ফলন হয়। এ বছর আবাদি জমি বাড়লেও ফলন কিছুটা কম। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় তরমুজের দামও কমে গেছে। ফলে অর্ধেক চাষি লোকসানের ঝুঁকিতে রয়েছেন।



