কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসির) সরবরাহ করা ব্রি ধান-৮৮ বীজে ভিন্ন জাতের মিশ্রণ থাকায় বিপাকে পড়েছেন কয়েক শ’ কৃষক। তাদের অভিযোগ, বীজে মিশ্রণ থাকায় সব ধান একসাথে পাকছে না। ফলে, তারা সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জেলার করিমগঞ্জের বড়হাওরে সরেজমিন গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে নিজের ক্ষেতের পাশে বসে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন গুণধর ইউনিয়নের মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান (৫০)।
তিনি বললেন, ‘১৩ কানি (৩৫ শতাংশে কানি) জমিত বিএডিসির ৮৮ ধান করছিলাম। ধানতো শুরুতে চেনা যায় না। অহন আমার ক্ষেতে অর্ধেকেও ৮৮ ধান নাই। বাকি ধানগুলো চার-পাঁচ জাতের হইছে। কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডার হগলে দুধ আইছে। কুনুডার শীষ অহনও কাঁচা। অহন আমি ধান ক্যামনে কাটবাম। কোনডা কাডবাম। পাকনাডা কাটলে কাচাডা কাডন যাইতো না। ধারকর্জ কইরা চাষ করছি। কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান অইলোঅইলে। অহন ১০০ মণ ফাইয়াম কি-না সন্দেহ। অহন আমার এ ক্ষতিপূরণ কেলা দিবো। ‘
সেখানে কথা হয় খয়রত গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিকের (৪০) সাথে তিনি বলেন, ‘১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। এটি কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেত। সিড ভিলেজ প্রদর্শনী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)'-এর আওতায় তাকে এ প্রদর্শনী ক্ষেত করতে দেয়। বীজধান সরবরাহ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। এখানেও একই অবস্থা। এ ক্ষেতে বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে। অর্ধেক ধানও তিনি বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন না বলে জানান।’
বড় হাওরে বোরো আবাদ করা কৃষক মদন গ্রামের আক্তার মিয়া (৬৫) ও জমির উদ্দিনেরও (৫৫) একই অভিযোগ। তারা জানান, যারা ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সবার ক্ষেতেই মিশ্রণ ঢুকে গেছে। ফলে প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যারা ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন, তাদের পথে বসতে হবে।
শুধু হাবিবুর, ওমর সিদ্দিক, আক্তার মিয়া ও জমির উদ্দিন নয়, হাওরে যারা এবার বিএডিসি থেকে বীজ এনে ব্রি ধান-৮৮ চাষ করেছেন, তাদের সবার জমিতে একই অবস্থা।
জেলার হাওর উপজেলাগুলোর মাঠ পর্যায়ের অন্তত ২০ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিনিধিকে ধারণা দেন, দশ হাজার হেক্টর পরিমান জমিতে এরকম অবস্থা হয়েছে। মোটকথা এবার যারাই বিএডিসির ব্রি-ধান ৮৮ এর- বীজের চারা রোপন করেছেন তাদের ক্ষেতের অবস্থা কমবেশি একই। তাদের কেউই ঘরে তুলতে পারবে না ফসল।
কৃষকরা জানান, বিএডিসির ৮৮ জাতের বীজে ছিল নানা জাতের ধানের মিশ্রণ, এ কারণেই ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধান হয়েছে জমিতে। পাকছেও একেক সময়ে। একটি গোছাতেই তিন-চার ধরনের ধান হয়েছে। ক্ষেতের এই অস্বাভাবিক চিত্র দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। কৃষি ও বীজ অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না কৃষক।
কেউ কেউ বলছেন, বিএডিসি চুক্তিভিত্তিক চাষিদের উৎপাদিত মানসম্মত বীজ সরবরাহের কথা থাকলেও এবার তাদের বীজে ভেজাল ছিল। আর সেই ভেজালের খেসারত গুনছে কৃষক।
বীজগুলো কৃষকেরা কিনেছিলেন বিএডিসির অনুমোদিত স্থানীয় বীজ ডিলার ও সাব ডিলারদের কাছ থেকে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এবার পুরো জেলায় বোরোধান চাষ হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে। করিমগঞ্জে বড়হাওরসহ বেশ কিছু হাওরে এবং হাওর উপজেলা ইটনাসহ কয়েকটি উপজেলায় এ জাতের অস্বাভাবিক ফলন দেখা গেছে। কৃষি বিভাগ বিষয়টির খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো: সাদিকুর রহমান বললেন, ‘তিনি মাঠ পর্যায় থেকে সমস্যাটি শুনে কৃষি কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠিয়েছিলেন। তারাও ব্রি-ধান ৮৮-এর বীজে মিশ্রনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। ওইসব জমিতে কিছুধান পেকে গেছে, কিছু ধান আধাপাকা আবার কিছু ধান কাচা রয়েছে। আবার কিছু ধানে শীষই বের হয়নি। মানে বিভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ ছিল ব্রি ধান ৮৮ বীজের প্যাকেটে। এখন কতটুকু জমি বা কতোজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তালিকা করা হচ্ছে। আর আমরা বিএডিসিকেও বিষয়টি জানিয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এতে বোরো ফলনে সার্বিকভাবে বড় ধরণের প্রভাব না পরলেও কিছুটা প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
বিএডিসি (বীজ বিপনন) বলছে, বোরো চাষের জন্য মৌসুমের শুরুতে এবার প্রায় ৩৭০টন ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ সরবরাহ করেছে তারা। পরে আরো ৩১৮ টন বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন উৎস থেকে তাদের কাছে বীজ আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিক কোথায় সমস্যাটি হয়েছে, কোথা থেকে এ বীজ এলো-তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উপ-পরিচালক (বীজ বিপনন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমরাও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি কোথা থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেল। কোনো ডিলার যদি কৃষকদের বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। আর আমাদের নিজস্ব কোনো উৎস থেকে, বিশেষ করে বিএডিসি যেসব জায়গা থেকে বীজ আনে সেসব জায়গা থেকে যদি এমন বীজ এসে থাকে তাহলে আমরা এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
কিশোরগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উপ-পরিচালক (বীজ উৎপাদন) হারুনুর রশীদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ন্যাচারাল মিউটেশনের কারণে একই ফসলের মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, বেশি বয়সের চারা রোপন কিংবা বীজের উৎসে ত্রুটি থাকলেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’
জেলার করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুরের হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষে দেখা দিয়েছে এমন অস্বাভাবিকতা। বেশি দেখা দিয়েছে করিমগঞ্জ ও ইটনা উপজেলায়। করিমগঞ্জের বড় হাওরসহ কয়েকটি হাওরে ভয়াবহ অবস্থা। সেখানে কৃষকরা রীতিমতো কাঁদছেন। আরো কিছু এলাকা থেকেও এমন খবর আসছে। তবে সেখানকার অবস্থা এমন শোচনীয় নয়।
এ অবস্থায় কৃষকরা তাদের ফসল একসাথে কাটতে পারবে না। ঘরে তুলতে পারবে না ফসল। কৃষকদের অভিযোগ বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-ধান ৮৮- এর বীজে মিশ্রণের কারণে তারা এ ভোগান্তিতে পড়েছেন।


