সিলেট-১ (মহানগর) আসন

খন্দকার মুক্তাদির না মাওলানা হাবিবুর- কে হাসবেন শেষ হাসি

জাতীয় রাজনীতিতে মর্যাদার আসনখ্যাত সিলেট-১ (সিটি করপোরেশন-সদর উপজেলা) আসনের দিকে দৃষ্টি সিলেট বিভাগের প্রায় ১ কোটি ভোটারের। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে কে হচ্ছেন মর্যাদার এই আসনের কাণ্ডারি, সর্বত্রই এখন সেই আলোচনা।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান
বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান |নয়া দিগন্ত

জাতীয় রাজনীতিতে মর্যাদার আসনখ্যাত সিলেট-১ (সিটি করপোরেশন-সদর উপজেলা) আসনের দিকে দৃষ্টি সিলেট বিভাগের প্রায় ১ কোটি ভোটারের। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে কে হচ্ছেন মর্যাদার এই আসনের কাণ্ডারি, সর্বত্রই এখন সেই আলোচনা। ভোট ঘনিয়ে আসায় চায়ের কাপেও উত্তাপ বেড়েছে।

বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, নাকি জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমান— কার গলায় উঠবে বিজয়ের মালা? এ নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতুহল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আসনের ভোটাররা এখন প্রতীক নয়, প্রার্থী নির্ভর ভোট দেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা এখানে অনেক বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম চায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতি।

তাদের মতে, সিলেট-১ আসন শুধু একটি সংসদীয় এলাকা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবেগের প্রতীক। এখানকার ভোটের ফলাফল প্রায়ই দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত দেয়। তারা বলছে, সিলেট হচ্ছে প্রবাসী অধ্যুষিত, শিক্ষিত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন একটি অঞ্চল। ফলে এখানকার ভোটে আবেগের পাশাপাশি যুক্তিও বড় ভূমিকা রাখে।

ভোটাররা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতের দু’জনই যোগ্য প্রার্থী। তবে এবারের ভোটারের বেশির ভাগই তরুণ। অনেকেই বলছেন, সিলেটের উন্নয়নে ও দুর্নীতিমুক্ত থেকে যিনি বেশি গ্রহণযোগ্য, তাকেই সাধারণ জনগণ বেছে নেবে। সিলেট নগর ও সদর উপজেলার ভোটারদের একটি বড় অংশ শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সততা ও স্থানীয় ইস্যুকে গুরুত্ব দেন।

অনেক তরুণই বলছেন, আমরা চাই এমন একজন এমপি, যিনি শুধু দল নয়, শহরের জন্য কাজ করবেন। তারা বলছেন, আগের মতো আবেগনির্ভর ভোট আর হবে না। এবার প্রার্থীদের মাঠে উপস্থিতি, বাস্তব পরিকল্পনা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই হবে প্রভাবক।

সিলেট বিভাগের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এক সময় নির্বাচন করেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী, বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের সাবেক চেয়ারম্যান, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চার্টাড একাউন্টেন্ট (সিএ) ডিগ্রিধারী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মরহুম এম সাইফুর রহমান। তার সঙ্গে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম আবুল মাল আবদুল মুহিত। দুই কিংবদন্তী রাজনীতিকের তুমুল লড়াই শুধু সিলেট নয়, দেশের মানুষকেও টানতো। উন্নয়ন, সুশাসন, অর্থনীতি— সবকিছুই এই আসনের নির্বাচনে প্রতিফলিত হতো।

যদিও সিলেট-১ আসনে সিলেটের সেই মেধাবী প্রার্থীরা নেই, তবু কমেনি আসনটির গুরুত্ব।

তথ্য বলছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম সাইফুর রহমানকে হারিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল মাল আবদুল মুহিত জয় পান এ আসনে। এর পর ২০১৮ সালে জয় পান তার ছোট ভাই ড. এ কে আব্দুল মোমেন, যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। ৫ আগস্ট পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। পুরো খেলাই এখন বিএনপি বনাম জামায়াতের মধ্যকার। ফলে সিলেটে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়— কে পরছেন বিজয়ের মুকুট? বিএনপি, নাকি জামায়াতের প্রার্থী।

তথ্য মতে, এই আসনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও ভোটের মাঠে মূল লড়াই হবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও এবং জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের মধ্যে। দু’জনই সিলেটের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত ও জনসম্পৃক্ত নাম।

তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে ৮৪০ কোটি টাকা ঋণখেলাপীর তথ্য মাঠে ছড়িয়ে পড়ায় ভোটের মাঠে কিছুটা বেকায়দায় রয়েছেন ব্যবসায়ী ও বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এম সাইফুর রহমান ও ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতিতে বিএনপির রাজনীতিতে উত্থান ঘটে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের।

অন্যদিকে মাওলানা হাবিবুর রহমান শহর ও সদর উপজেলার তৃণমূল ভোটারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাই দীর্ঘদিন থেকে স্বাস্থ্য-সেবায় দারিদ্র্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। সমাজসেবা ও জনসম্পৃক্ততার জন্য তার জনপ্রিয়তা এখনো অটুট।

দুই প্রার্থীই নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা শেষ করেছেন। এখন কেবল ভোটের পালা।

মেজরটিলার পূরবী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা নাছিমা বেগম বলেন, ১৭ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত সিলেটের মানুষ। বন্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেল যোগাযোগ, পর্যটন শিল্প-চা শিল্প প্রবাসীদের নানা সঙ্কট, সব মিলিয়ে বিগত বছরগুলোতে উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও লাগেনি এ অঞ্চলে। তাই এবার নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নসারথী জামায়াত মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দেবো।

ইসির তথ্য বলছে, সিলেট-১ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬ জন ও নারী ভোটার ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন। অর্থাৎ মোট ভোটের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী।

বিএনপি-জামায়াতের দুই শিবিরই মনে করছে, তরুণ ও নারী ভোটাররাই এ আসনে জয়-পরাজয়ে মূল ভূমিকা রাখবেন ।