মাতৃভূমির স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায় রোহিঙ্গাদের, ৯ বছরেও ফেরার পথ অনিশ্চিত

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ, শান্তিপ্রিয় ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন—যারা শুধু নিরাপদে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চান।

হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া (কক্সবাজার)

Location :

Cox's Bazar
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অসহায় শিশুরা
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অসহায় শিশুরা |নয়া দিগন্ত

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। রোহিঙ্গাদের কাছে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি স্বজন হারানোর দিন, ঘরবাড়ি হারানোর দিন, মাতৃভূমি ছেড়ে অজানা পথে পাড়ি জমানোর দিন। প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার সেই ভয়াল স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি তারা।

সেই দিন থেকে কেটে গেছে দীর্ঘ নয় বছর। লাখ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। কিন্তু এত বছরেও নিজ ভূমি মিয়ানমারের রাখাইনে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ খোলেনি।

ক্যাম্প-১১-এর রোহিঙ্গা নারী সেতারা, মায়েশা ও সানজিদা বলেন, মিয়ানমারে ভয়াবহ সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখে সবকিছু ফেলে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। তাদের অভিযোগ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর লোকজন মিলে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে হামলা, হত্যা, নারী নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ চালায়।

সেতারা বলেন, ‘আমার বয়স তখন মাত্র আট বছর। আমার চোখের সামনেই আমার মায়ের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। বাবা বাধা দিতে গেলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর আমাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘তিন দিন তিন রাত পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে দাদির সাথে আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সেই দিনের কথা এখনো আমার মনে আছে। বাংলাদেশে এসে এ দেশের মানুষ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে। সেই সময়ের কথা মনে হলে আজও চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।’

একই ক্যাম্পের বাসিন্দা মায়েশা জানান, বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় স্বামীকে হারিয়ে তিনি এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

তার ভাষ্য, ‘আমার স্বামী কেফায়েত উল্লাহকে ধরে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। এরপর আমাকেও নির্যাতন করা হয়। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। মৃত ভেবে তারা আমাকে ফেলে চলে যায়।’

পরে পাশের বাড়িতে আগুন দেয়ার সময় মানুষের চিৎকারে তার জ্ঞান ফিরে আসে। স্বজনদের সহায়তায় সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন মায়েশা।

সানজিদা জানান, তার বাবা মিয়ানমারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ছিলেন। দেশ ছাড়ার আগে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু যার সাথে তার বিয়ের কথা ছিল, তাকেও হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘এরপর মা-বাবার সাথে রহমতেরবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসি। এখানে এসে আমার বিয়ে হয়েছে আকিয়াব শহরের এক রোহিঙ্গা যুবকের সাথে।’

বাংলাদেশে আশ্রিত জীবন নিয়ে আক্ষেপ করে সানজিদা বলেন, ‘আমাদের সেখানে গোয়ালভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর অনেক জমিজমা ছিল। আমরা এখানে বেড়াতে আসিনি। প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি।’

রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, ‘বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছু অপরাধপ্রবণ মানুষ থাকতেই পারে। তবে কয়েকজনের অপরাধের দায় পুরো জাতির ওপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।’

তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ বাংলাদেশীকে যদি কোথাও এক জায়গায় রাখা হয়, সেখানেও চোর, ডাকাত ও নানা ধরনের অপরাধপ্রবণ মানুষ পাওয়া যাবে। রোহিঙ্গাদের মধ্যেও কিছু খারাপ মানুষ আছে, যারা অপহরণ, মাদক ও মানবপাচারের মতো অপরাধে জড়িত। কিন্তু তাদের জন্য পুরো রোহিঙ্গা জাতিকে সন্ত্রাসী বলা যায় না।’

তার মতে, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ, শান্তিপ্রিয় ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন—যারা শুধু নিরাপদে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চান।’

মানবাধিকার নেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসি বলেন, ‘২০১৮ ও ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একাধিক উদ্যোগ ও আলোচনা হলেও বাস্তবে তার কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের অনেক আলোচনা ও আয়োজন আমরা দেখেছি। কিন্তু নয় বছরেও একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে প্রত্যাবাসন হতে দেখিনি।’

২৫ আগস্ট তাই আজও রোহিঙ্গাদের কাছে শুধু একটি স্মরণদিবস নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মৃতি, জ্বালিয়ে দেয়া বসতভিটার স্মৃতি এবং ফেলে আসা মাতৃভূমিতে ফেরার আকুতির দিন।

নয় বছর পরও তাদের প্রশ্ন একটাই—কবে ফিরবে তারা নিজেদের দেশে? কবে খুলবে রাখাইনে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ?

বাংলাদেশ তাদের জীবন রক্ষায় আশ্রয় দিয়েছে, মানবিকতার হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু শরণার্থী শিবির কোনো জাতির স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে না। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারেই। আর তাই ২৫ আগস্টের সেই কালো দিন স্মরণ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আবারো জোরালো হয়ে উঠছে একটি দাবি—রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধান এবং মিয়ানমারে তাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত প্রত্যাবাসন।