স্ত্রী মুন্নি আক্তার

শহীদ মানিক মিয়ার কবরে শিশু সন্তান চকলেট দিয়ে বলে বাবা খেয়েছে

মানিক মিয়া ১৮ জুলাই বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীদের পানি খাওয়াতে গিয়ে রংপুর মহানগরীর মডার্ন ব্রিজে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো
নিহত অটোচালাক মানিক মিয়ার মা নুরজাহার বেগম (বাঁয়ে) ও স্ত্রী মুন্নি আক্তার
নিহত অটোচালাক মানিক মিয়ার মা নুরজাহার বেগম (বাঁয়ে) ও স্ত্রী মুন্নি আক্তার |নয়া দিগন্ত

রংপুরে গত বছর ১৮ জুলাই গুলিতে নিহত অটো চালক মানিক মিয়ার দুই বছরের সন্তান কবরে প্রতিদিনই এখন চকলেট নিয়ে যায়, নিজের অজান্তেই বলে বাবা চকলেট খেয়েছে। এমনটাই জানান তার স্ত্রী মুন্নী বেগম। আর মা নুরজাহান বেগম জানালেন, একবছর বাবা আমাকে মা বলে ডাকে না। তিন মাস থেকে জ্বর-বাবা থাকলে বার বার খোঁজ নিতো।

শুক্রবার (১৮ জুলাই) তার শাহাদতের দিনে নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন স্ত্রী মুন্নি বেগম। মানিক মিয়া ১৮ জুলাই বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীদের পানি খাওয়াতে গিয়ে রংপুর মহানগরীর মডার্ন ব্রিজে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান। সকাল থেকেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

শহীদ মানিক মিয়ার স্ত্রী মুন্নি আক্তার তার ১৭ মাসের সন্তানকে কোলে নিয়ে বলেন, ‘বিগত একটি বছর হয়ে গেলো। আপনজন হারার ব্যাথা আজও প্রতি সেকেন্ড মিনিটে মনে করিয়ে দেয় সেদিনের কথা। যতদিন বেঁচে থাকবো। ভুলতে পারবো না। ১৭ বছরের বাচ্চাকে রেখে শহীদ হয়ে যায় আমার স্বামী। আমার সন্তান বাবার কবরের পাশে দুই হাতে চকলেট নিয়ে যায়। দোয়া করতে যায়। মাঝে মধ্যে বাবার কবরে চকলেট দিয়ে বলে মা বাবা খেয়ে ফেলেছে। আমাদের এই কষ্ট কি সরকার আমাদের ফিরিয়ে দিতে পারবে? আমার এই ছেলে কি বোঝে। সে বাবার জন্য চকলেট নিয়ে কবরের পাশে যায়। বলে বাবা চকলেট খা।’ এই বলে হুহু করে কাঁদতে থাকেন মুন্নি আখতার।

আন্দোলনে যাওয়া ও শেষ কি কথা হয়েছিল স্বামীর সাথে তা উল্লেখ করে মুন্নি বলেন, ‘আমার স্বামীর পেশা ছিল অটো চালক। আমরা কোনো দল বা পার্টির সাথে যুক্ত ছিলাম না। যা ইনকাম করতো তা দিয়েই আমাদের সংসার ভালো চলতো। আমাদের এখানে চায়ের দোকানে কিছু ভার্সিটির ছেলে সবসময় আড্ডা দিতো। তারা আমার স্বামীকে বড়ভাই হিসেবে খুব সম্মান করতো। সে কারণে সেদিন সকাল ১০টা থেকেই সে আন্দোলনে যোগ দেয়। আমি বলেছিলাম, ময়নার আব্বু তুমি যেয়ো না। আমাকে কথা দিয়েছিল যাবে না। কিন্তু তারপরেও সে আন্দোলনে যায়। দেশের স্বার্থে সে আন্দোলনে গিয়েছিল। বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের দিকে আমি ওকে ফোন দিয়ে বলি ময়নার আব্বু তুমি কোথায়। তখন গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি বললাম তুমি আসো তারাতারি। তখন সে বলে আমি যাচ্ছি কয়েক মিনিটের ভেতরে। সব শেষ এতটুকুই কথা হয়েছে তার সাথে। এরপর ৫/৭ মিনিট পর কিছু ছেলে ট্রাকে করে আসতেছে। আর বলতেছে। মানিক মামার বুকে গুলি লাগছে। মানিক মামার বুকে গুলি লাগছে। পরে মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়ার পর ইসিজি করে ডাক্তার ঘোষণা দেয় যে উনি মারা গেছে।’

লাশ নিতে টর্চার এবং দ্রুত দাফনের বিষয়ে মুন্নি আক্তার বলেন, ‘লাশটা দেয়া নিয়েও আমাদেরকে অনেক টর্চার করেছে। তারা ভালোভাবে আমার আপনজনকে দেখতেও দেয়নি। দ্রুত গতিতে তারা দাফন করেছে। তার স্মৃতি হিসেবে আমরা কিছুই রাখতে পারি নাই।’

শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও কবরগুলো সুন্দরভাবে পাকা করার দাবি জানিয়ে মুন্নি বলেন, ‘যাদের রক্তের বিনিময়ে এই বাংলাদেশ পেলাম। অনেক দলের অনেক কথা শুনলাম। আদৌ কি তারা শহীদদের জন্য কিছু করেছে। তাদের কবরগুলো পর্যন্ত সংস্কার করা হয়নি। কবরগুলো ভালোভাবে সুন্দর করে নির্মাণ করার দাবি জানাই। শহীদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হোক। এটা আমরা চাই।’

ভাতা দেয়ার দাবি করে মুন্নি বলেন, ‘সরকার আমাদের মার্চ মাস থেকে ভাতা দিতে চাচ্ছে। কিন্তু জুলাইও শেষ হতে চলেছে। তবুও আমরা ভাতা পাইলাম না। আমরা অনেক কষ্টে জীবন যাপন করছি। সরকার ভাতাটা চালু করলে আমরা বাচ্চাটাকে নিয়ে ভালো থাকতে পারবো। একটি বছর হয়ে গেলো।’

জুলাই সনদ এ মাসের মধ্যেই দেয়ার দাবি জানিয়ে মুন্নি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে প্রতিটি জুলাই যোদ্ধা ও শহীদরা চাই জুলাই সনদ দেয়া হোক। তাহলে আমাদের স্বীকৃতি হবে। কিন্তু সরকার সেটা করছে না। এই মাসের মধ্যেই আমরা জুলাই সনদ চাই। আর মডার্নের অর্জন মোড়ে আমি শহীদ মানিকের স্মৃতি সংরক্ষণ চাই। ‘

স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে মুন্নি আক্তার বলেন, ‘মামলা করেছিলাম। এখনও মামলা সিআর হিসেবে আছে। এখনও মামলার তদন্ত চলছে না। আমার স্বামীকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে তাদের আমি বিচার চাই।’

মেডিক্যোলে গেলে চিকিৎসা পাওয়া যায় না উল্লেখ করে মুন্নি বলেন, ‘আজকে শহীদদের মা, শহীদদের বোন শহীদদের মাকে রাস্তায় রাস্তায় শুয়ে থাকেত হয়। মেডিক্যালে বারান্দায় শুয়ে থাকতে হয়। কোনো চিকিৎসা হয় না। চিকিৎসকদের যদি বলি আমরা শহীদদের স্ত্রী। একটা বেড দেয়া যায় না। তখনও তারা আমাদের মুল্যয়ন করে না। এটা অনেক কষ্টের কথা। ’

শেষ দেখাটাও দেখতে পারেন নাই উল্লেখ করে মানিকের মা নুরজাহান বলেন, ‘বাবার সাথে আমার দেখা হয়েছে আবু সাঈদ যেদিন গুলি খায় সেদিন। সেদিন বৃষ্টি হইছিল। বাবা আমাকে ছাতা দিয়ে লালবাগ পাঠাইছিল। আর দেখা হয় নাই। বৃহস্পতিবার সকালে বাবা ভাত খেয়ে আন্দোলনে গেছে। পরে শুনি গ্যাস খাইছে। আমার বাবা যে গুলি খাইছে সেটা কেউ আমাকে বলে নাই।‘

একবছর থেকে মা ডাক শুনি না উল্লেখ করে নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমার বড় ইতিহাস বড় দু:খ। আমার বাবার কাছে আমি কি চাইলাম হয়। কি নিলাম হয়। আমি আমার বাবার কিছু চাই না। বাবার মুখে ডাক চাই। কোনোদিন ব্যাবার কাছে কিছু চাই নাই। সেই বাবার মা ডাক আমার এক বছর থেকে নাই। এক বছর থেকে বাবার মুখের ডাক পাইলাম না।‘

স্মৃতি আওড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বয়োবৃদ্ধা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘বাবা বলে মা তোমার কি লাগবে। এখন আমার এই কথা বলার লোক নাই। আজকে আমার তিনমাস থেকে জ্বর। আমাকে এখন পর্যন্ত কেউ দেখতে আসে নাই। আমার খোঁজ করতে আসে নাই। আমার যদি সন্তান থাকতো। আমার খোঁজ করতো। আল্লাহ তুই আমার খোঁজ করো। বাবাতো নাই। আমি কারো দোষ দেই না। আমার ভাগ্যোত নাই।’

ছেলে হত্যার বিচার দাবি করে নুরজাহান বলেন, ‘যারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে। তাদের আমি বিচার চাই। বিনা অপরাধে আমার বাবা মারা গেছে। তাদের আমি ফাঁসি চাই। থানায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বলা হয়েছে। মামলার এখনও কাজই শুরু হয় নাই।’

মানিক হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী রবার্টসন্সগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহত জুলাই যোদ্ধা প্রিন্স আহমেদ পলাশ বলেন, ‘১৮ জুলাই প্রথমত আমরা সবাই মডার্ন ব্রিজে ছিলাম। মানিক মিয়া ভাই আমাদেরকে পানি বিতরণ করতেছিল। সবাইকে পানি খাওয়াছেন। তার সাথে ছোট একটা ছেলে ছিল। সেও পানি খাওয়াইছে। যখন পুলিশ গুলি ছোড়া শুরু করলো। তখন মানিক ভাই একটু পিছিয়ে গেলো। আমরা শিক্ষার্থীরা পুলিশকে ধাওয়া করলাম। সে সময় পিছনে পড়ার কারণে সে আর ভিডিওর ফ্রেমে আসলো না। আমার হাতেও গুলি লাগে। তারপরেও আমি আবার যাই। সেখানে দুইভাইকে গুলি লেগেছিল। তাদেরকে নিয়ে গিয়ে কোর্ট পাড়ায় আশ্রয় দেই। আবার আমরা মডার্ন ব্রিজে আসি। তখন পুলিশ এলোপাথারি গুলি করে আমাদের ধাওয়া দেয়। ওই সময় ব্রিজেই দাঁড়িয়েছিল ছিল মানিক ভাই। তখন গুলি লাগে। আমি তার কাছে দৌঁড়ে যাই। তখন আবারও পুলিশ আমাদের ধাওয়া করে। তখন ছাত্রদের ডাকি-আপনারা সবাই আসেন। আমরা একত্রিত হয়ে পুলিশকে ধাওয়া দেই। পরে সেখানে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজের কিছু ভাই গুলিব্ধি মানিক ভাইকে কাঁধে করে মেডিক্যালের দিকে নিয়ে যায়।

গুলিতে নিহত অটো চালক মানিক মিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত বছর ২০ আগস্ট ১১৯ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন মা নুরজাহান বেগম। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (বাধ্যতামূলক অবসর) মো. মনিরুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য জাকির হোসেন সরকার, সাবেক এমপি নাছিমা জামান ববি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষের ছেলে রাশেক রহমান, রংপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার উত্তম কুমার পাল, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার উৎপল রায়, সহকারী পুলিশ কমিশনার ইমরান হোসেন, সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার ওসি রবিউল ইসলাম, মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মন্ডল, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাশেম, তাজহাট থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইমাদ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ও সাময়িক বরখাস্ত সিটি কাউন্সিলর জাকারিয়া আলম শিপলু, ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান মিজু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রামাণিক, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী তুহিন, মহানগর যুবলীগের সভাপতি সিরাজুম মুনির বাশার, সাধারণ সম্পাদক মুরাদ হোসেন, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির এপিএস কামরুজ্জামান তুহিন, জেলা যুবলীগ সভাপতি লক্ষ্মীণ চন্দ্র দাস, কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আকিমুল ইসলাম, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক শামীম মাহফুজ, কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাফিউর রহমান রাফি, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হক, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেকসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাসহ ১১৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামাদের নামে মামলা হয়। কিন্তু মামলাটি এখনও সিআর হিসেবে আছে। এর কোনো আদেশ হয়নি।

গত বছর ১৬ জুলাই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক উচিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। আবু সাঈদ হত্যার দু'দিন পর ১৮ জুলাই রংপুরের মডার্ন মোড়ে আন্দোলনের সময় গুলিতে নিহত হন অটোচালক মানিক মিয়া। পরে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।