দেড় বছরের নিঃশব্দ যুদ্ধের পর থেমে গেল শফিকের শ্বাস

‘শফিক বেঁচে থাকলে হয়তো আর দশজনের মতো জীবন পেত না। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিল, আন্দোলনের ক্ষত অনেক সময় গুলির শব্দ থেমে যাওয়ার পরও রক্ত ঝরায়।’

ময়মনসিংহ অফিস

Location :

Mymensingh
জুলাইযোদ্ধা ময়মনসিংহের সন্তান শফিকুল ইসলাম শফিকের দাফন সম্পন্ন হয়েছে
জুলাইযোদ্ধা ময়মনসিংহের সন্তান শফিকুল ইসলাম শফিকের দাফন সম্পন্ন হয়েছে |নয়া দিগন্ত

গুলির শব্দ থেমে যায় বহু আগেই। রাজপথে আর নেই সেই উত্তাল স্লোগান, নেই আন্দোলনের ভিড়। কিন্তু শফিকুল ইসলাম শফিকের (৩৫) শরীরে রয়ে গিয়েছিল সেই এক মুহূর্তের ক্ষত, যা ধীরে ধীরে কেড়ে নিল তার জীবন।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকাল ১০টায় ময়মন‌সিং‌হের হালুয়াঘাট উপজেলার দর্শারপাড় মামা পাগলা মাজার মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে তাকে পা‌রিবা‌রিক কবরস্থানে দাফন হয়।

এর আগে, মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকা‌লে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিক‌্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

নিহত শফিকুল ইসলাম হালুয়াঘাট উপজেলার দর্শারপাড় গ্রামের আব্দুল সামাদের ছেলে। বর্তমানে পরিবারটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গী-পূর্ব এলাকায় বসবাস করছিল। শফিক গাজীপুরের গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধা।

পা‌রিবা‌রিক সূ‌ত্রে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরা আজমপুরে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার এই যুবক। সময়টা ছিল ২০২৪ সালের আগস্ট। আন্দোলনের উত্তাল দিনে হঠাৎ ছুটে আসে গুলি। সেদিন রাজপথেই লুটিয়ে পড়েন শফিক। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে শুরু হয় তার দীর্ঘ চিকিৎসাযাত্রা, যা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় দেড় বছরের এক নীরব মৃত্যুযুদ্ধে।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথমে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে, পরে একের পর এক চিকিৎসাকেন্দ্রে শফিককে নিয়ে যান তার পরিবার। অস্ত্রোপচার, ইনজেকশন, অক্সিজেন, স্যালাইন সবই ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। হাঁটতে পারতেন না, স্বাভাবিক জীবন ছিল দূরের কথা।

পরিবারের একজন সদস্য বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন আশা করতাম, আজ হয়তো একটু ভালো হবে। কিন্তু সময় যত গেছে, শফিক তত নিঃশব্দে ভেঙে পড়েছে।’

দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় শফিকের। সম্প্রতি তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। শ্বাসকষ্ট বাড়লে তাকে ভর্তি করা হয় গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিক‌্যাল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি। মঙ্গলবার সকা‌লে নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ।

শফিকের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছানোর পর হালুয়াঘাটের গ্রামটিতে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। যে ছেলেটি একদিন আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, তাকে সবাই দেখেছে হুইলচেয়ারে, হাসপাতালের বেডে, কিন্তু কেউ ভাবেনি এভাবেই তার গল্প শেষ হবে।

এক প্রতিবেশী বলেন, ‘শফিক বেঁচে থাকলে হয়তো আর দশজনের মতো জীবন পেত না। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিল, আন্দোলনের ক্ষত অনেক সময় গুলির শব্দ থেমে যাওয়ার পরও রক্ত ঝরায়।’

শফিকুল ইসলাম শফিকের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি প্রশ্ন তোলে, আন্দোলনে আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়ে। দেড় বছর ধরে মৃত্যুর সাথে লড়ে যাওয়া এই যুবকের জীবন থেমে গেল নীরবে। কিন্তু তার শরীরে বহন করা ক্ষত আর মৃত্যুর গল্প ইতিহাসে থেকে যাবে একজন আন্দোলনের আহত সাক্ষী হিসেবে।

হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলীনূর খান জানান, মৃত্যুর খবর পেয়ে লাশ হালুয়াঘাটে আনা হ‌য়ে‌ছে। আজ বুধবার সকাল ১০টায় শফিকুল ইসলামের জানাজা শে‌ষে যথাযথ মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়ে‌ছে।