খালেদা জিয়ার পর সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া নারী এমপি রিতা মন্ত্রিত্বের দৌড়ে

মানিকগঞ্জ-৩ আসনের জনগণ জেলা আহ্বায়ক বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খান রিতাকে নারী হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার পর সর্বোচ্চ ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছেন। এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন রিতা।

মো: শাহানুর ইসলাম, মানিকগঞ্জ

Location :

Manikganj
খালেদা জিয়ার পর সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া নারী এমপি রিতা মন্ত্রিত্বের দৌড়ে
খালেদা জিয়ার পর সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া নারী এমপি রিতা মন্ত্রিত্বের দৌড়ে |নয়া দিগন্ত

মানিকগঞ্জ-৩ আসনের জনগণ জেলা আহ্বায়ক বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খান রিতাকে নারী হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার পর সর্বোচ্চ ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছেন। এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন রিতা।

বিগত ফ্যাসিস্ট-স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে বিপ্লবী ভূমিকা, কঠোর পরিশ্রম, ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা নেতাকর্মীদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়া, বাবা সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর রেখে যাওয়া জনহিতৈষী কাজ অব্যাহত রাখা এবং দলকে সুসংগঠিত করা সহ নানাবিধ কারণেই তার এ ভূমিধস বিজয় হয়েছে।

বিএনপির ঘাটি হিসেবে পরিচিত মানিকগঞ্জ জেলা মূলত তার নেতৃত্বেই এবার ৩টি সংসদীয় আসনের সবগুলোতেই বিজয়ী হয়ে মানিকগঞ্জ জেলাকে আবারো বিএনপির ঘাটিতে পরিণত করেছেন।

২০১৪ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আফরোজা খান রিতার নেতৃত্বে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা জেলার ৭টি উপজেলাতেই চেয়ারম্যান হিসাবে বিজয় অর্জন করে। সেই সময় জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন আফরোজা খান রিতা। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন এস এ জিন্নাহ কবীর। পরের দুজই এবার সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বচিত হয়েছেন।

এবার নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মানিকগঞ্জ-৩ (সদর-সাটুরিয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে রিতা পেয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটসমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ১০৩ ভোটের। ১৫১ কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৮টিতেই তিনি প্রথম হয়েছেন।

স্বাধীনতার পর এই আসনে তিনিই একমাত্র নারী সংসদ সদস্য। ব্যবধানের এই উচ্চতা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী নেতাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০১ সালে বগুড়া-৬ আসনে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৫ ভোট পান। বিজয়ী হন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে। ২০০৮ সালে বগুড়া-৭ আসনে তিনি ২ লাখ ৩২ হাজার ৭১৬ ভোট পেয়ে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ব্যবধানে জেতেন। সেই ঐতিহাসিক নজিরের পর ব্যবধানের রাজনীতিতে বড় পরিসরে আলোচনায় এলেন রিতা।

তবে একতরফা ডামি নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হন। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৫৩৯। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এস এম জিলানী (বিএনপি)। তার প্রাপ্তভোটের সংখ্যা ছিল ১২৩। ভোটের ব্যবধান ছিলো ২ লাখ ২৯ হাজার ৪১৬ টি।এই নির্বাচনকে মূলত বিশ্বের কেউ স্বীকৃতি দেয়নি। আর সেই বিচারে নারী প্রার্থী হিসাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর স্বচ্ছ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়লেন আফরোজা খান রিতা।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি বিজয়ী নারী এমপিদের মধ্যে সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) ৭৯ হাজার ৩২১ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন ‘গুম’ হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর (লুনা)। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট; ব্যবধান ৭৯ হাজার ৩২১।

ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট; ব্যবধান ৪৩ হাজার ২৯৫। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা জিতেছেন ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটে। ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ এগিয়ে আছেন ৩২ হাজার ৯৫৩ ভোটে। নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন জয় পেয়েছেন ১২ হাজার ১৫৮ ভোটে।

দীর্ঘ ১৭ বছর মাঠে ময়দানে নিজে উপস্থিত থেকে ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন আফরোজা খান রিতা। তিনি হামলা-মামলায় জর্জরিত নেতা-কর্মীদের সার্বিক সহয়তা করা, সমমনা রাজনৈতিক দলের সাথে নিয়মিত সমন্বয় করা, মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ জননন্দিত কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।

পুরো জেলায় বিএনপির ব্যাপক ভোট প্রাপ্তির অন্যতম কারণ বলে জনগণ তার এইসব কল্যাণমূলক কার্যক্রমের ফল বলেও মনে করে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, বাবা শিল্পপতি ও শিক্ষানুরাগী হারুণার রশিদ খান মুন্নুর উত্তরসূরি হিসেবেও নির্বাচনে বিজয়ের পথ সুগম হয় রিতার। তার বাবা চার বার সংসদ সদস্য থাকাকালে জেলায় বিশেষ করে নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। বাবার সেই কাজও তার নির্বাচনে বিজয়ে সহায়তা করেছে।

আফরোজা খান রিতা বলেন, আমি কখনো মানিকগঞ্জের জনগণের উন্নয়নের বাহিরে কিছুই চিন্তা করতে পারি না। আর এবার আমার প্রিয় জনগণ তাদের ভোটাধিকারের মাধ্যমে আমার প্রতি ভালবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমি বাকি জীবন আমার জনগণের সাথে থেকে কাজ করে যেতে চাই। মানিকগঞ্জকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

আফরোজা খান রিতার বাবা সাবেক মন্ত্রী,শিল্পপতি মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নুর হাত ধরেই রাজনীতিতে আসেন বোর্ডস্ট্যান্ড করা মেধাবী ছাত্রী আফরোজা খান রিতা। তার বাবা ছিলেন চারবারের সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী।

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থীর বাবা হারুণার রশিদ খানের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় হতেই জেলা ও রাজধানী ঢাকায় দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের নিয়ে অংশ নেন তিনি।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ (হরিরামপুর ও সিঙ্গাইর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১০ সালে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরের বছর ২০১৩ সালে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে দলের কাউন্সিলের মাধ্যমে ৪৫ কাউন্সিলের প্রত্যক্ষ ভোটে ৪২ ভোট পেয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। গত ২ ফেব্রুয়ারি রিতাকে আহ্বায়ক করে জেলা বিএনপির সাত সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যও।

জেলা বিএনপির নেতা-কর্মীসহ সাধারণ জনগণের দাবি আগামীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও কেন্দ্রীয় বিএনপির অবশ্যই বিগত সময়ের অবদানের জন্যে, সততা ও ন্যায় পরায়ণতার জন্যে, দেশের উন্নয়নে অবদার রাখার জন্যে আফরোজা খান রিতাকে অবশ্যই একটি দায়িত্বশীল মন্ত্রাণালয়ের র্পূণমন্ত্রী করবেন।

বিএনপির দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে যে, মানিকগঞ্জ হতে রের্কড ভোটে বিজয়ী আফরোজা খান রিতা মঙ্গলবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহন করবেন।