উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশগত নিরাপত্তার মূল ভিত্তি তিস্তা নদীকে ঘিরে শুরু হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ খনিজ সম্পদ উত্তোলনের প্রতিযোগিতা। দিন-রাত শতাধিক ভারী যন্ত্রের বিকট শব্দের মধ্য দিয়ে নদী চিরে অনবরত খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ফলে চরম বিপর্যয়ে পড়েছে এই এলাকা।
শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশ কেটে গভীরে বসানো ‘বোমা মেশিন’ আর বর্ষায় ‘শেপ মেশিন’ ব্যবহারের ফলে নদীর বুকজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল বিশাল মৃত্যুফাঁদ।
অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর চুরির কারণে ভেস্তে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ, বদলে যাচ্ছে তিস্তার ঐতিহাসিক গতিপথ। কৃত্রিম এই গতি পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তীব্র নদীভাঙনে প্রতিদিন তছনছ হচ্ছে বসতবাড়ি, বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি আর সর্বস্ব হারাচ্ছে শত শত পরিবার।
জাতীয় জলসেচ কাঠামোর অতিগুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ও উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ‘তিস্তা সেচ প্রকল্প’। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই স্পর্শকাতর ব্যারেজের উজান এলাকাতেই কোনো প্রকার বৈধ অনুমোদন ছাড়া প্রকাশ্যে চলছে অবাধ পাথর শিকার। পুরো তিস্তাবাজার, তেলীরবাজার, চরখড়িবাড়ী, বাইশপুকুর, ছাতুনামা, দোহলপাড়া, কালীগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিয়েছে দখলদাররা।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তেলীরবাজার পয়েন্টে। এই একক এলাকাতেই বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে শতাধিক ভারী শ্যালো মেশিন এবং প্রায় আড়াই শ বিশেষ ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নদীর তলদেশে বিপজ্জনক গভীর খাদ তৈরি করে একেকটি বড় নৌকা থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ ঘনফুট (সিএফটি) পর্যন্ত পাথর তোলা হচ্ছে। এই লুটকৃত পাথরের বড় একটি অংশ আবার ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ের সামনের খালি জায়গা ও আশপাশের এলাকাতেই প্রকাশ্যে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে, যা পরে সুকৌশলে বিভিন্ন পাইকারি বাজারে চড়া দামে চালান হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তেলীবাজার এলাকার মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে মো. মানিক মিয়া (৪৫) এবং মো. আমির আলীর ছেলে জিয়ারুল হকের (৩৫) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে এই অবৈধ পাথর বাণিজ্য ও রুট গড়ে উঠেছে। এদের হয়ে মাঠপর্যায়ে সার্বিক তদারকি ও সরবরাহের মূল কলকাঠি নাড়ছে হোসেন আলীর ছেলে মো. হানিফ (৩৪), স্থানীয় হামিদুল ইসলাম (৫৫) ও তাঁর ছেলে রফিকুল ইসলাম (২৮)। নদী থেকে পাথর সংগ্রহের পর ঘাটে সাধারণ শ্রমিকের কাছ থেকে প্রতি সিএফটি ৫৫-৬০ টাকায় কেনা হলেও তা বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে সরাসরি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়। শুধু পাথর বিক্রিই নয়, তথাকথিত ‘লাইন মেইনটেনেন্স’ ও প্রশাসনিক সুবিধার দোহাই দিয়ে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। রেটচার্ট অনুযায়ী প্রতিটি মেশিন থেকে সাপ্তাহিক ৭ হাজার টাকা, প্রতিটি নৌকা থেকে সপ্তাহে ১ হাজার টাকা, প্রতি ট্রলি (প্রতি ট্রিপ) থেকে ১০০ টাকা এবং প্রতিটি পাথর প্রসেসিং কেন্দ্র থেকে মাসিক ৫ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে।
অবশ্য এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে নয়া দিগন্তের প্রতিবেদক যোগাযোগ করলে মানিক নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি কেবল একটি নৌকার মালিক এবং গয়াবাড়ীর একটি চক্রের সঙ্গে জিয়ারুল আংশিক জড়িত। অন্যদিকে জিয়ারুল হক দায় এড়িয়ে মানিককেই মূল হোতা আখ্যা দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নীলফামারী জেলার সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ্-আল-মামুন জানান, ইঞ্জিনচালিত কোনো যন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। নদী ও পরিবেশ রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘নদী থেকে এভাবে অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন বাঁধ ও নদীর স্থায়িত্বের জন্য চূড়ান্ত হুমকি। তিস্তার ডান তীরে ইতিমধ্যেই তীব্র ভাঙনে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে।’
তবে তিনি নদীতে এ জাতীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত নন জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায় জেলা প্রশাসকের ওপর ছেড়ে দেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘অবৈধ পাথর উত্তোলন রুখতে শিগগিরই বিজিবির সহায়তায় যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। বড় পরিসরে অভিযান চালিয়ে সরঞ্জাম জব্দসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘ইতোপূর্বেও আমরা সেখানে ৬৫ জনের একটি টিম পাঠিয়ে অভিযান চালিয়ে উদ্ধারকৃত মেশিনগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে (ক্রাশড) দিয়েছিলাম। কিন্তু অসাধু চোরের দল আবারো সুযোগ বুঝে নদীতে নেমেছে। আমি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর বার্তা দিয়েছি। খুব দ্রুতই টাস্কফোর্স গঠন করে তিস্তাকে রক্ষায় সর্বাত্মক অ্যাকশনে যাওয়া হচ্ছে।’



