হাজার কোটি টাকার খনন প্রকল্পেও পুনর্জীবন পায়নি ব্রহ্মপুত্র

এক সময়ের খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র নদ এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও বাস্তবে নদী খননের অগ্রগতি খুবই কম, অনেক স্থানে নদী প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ময়মনসিংহ অফিস

Location :

Mymensingh
হাজার কোটি টাকার খনন প্রকল্পেও পুনর্জীবন পায়নি ব্রহ্মপুত্র
হাজার কোটি টাকার খনন প্রকল্পেও পুনর্জীবন পায়নি ব্রহ্মপুত্র |নয়া দিগন্ত

এক সময়ের খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র নদ এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও বাস্তবে নদী খননের অগ্রগতি খুবই কম, অনেক স্থানে নদী প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নেভিগ্যাবিলিটি ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড এক্সকাভেশন অব ওল্ড ব্রহ্মপুত্র নামে একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা এবং মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। এ প্রকল্পের আওতায় জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পর্যন্ত প্রায় ২২৭ কিলোমিটার নদীপথ খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়।

কিন্তু প্রকল্প শুরুর প্রায় পাঁচ বছর পরও কাজের অগ্রগতি খুবই সীমিত। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং আরো কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। তাদের অভিযোগ, কয়েক বছর কাজ চললেও দৃশ্যমান উন্নতি খুবই কম। অনেক স্থানে খননকাজ শুরু হলেও নদীর তীরেই বালু ফেলে রাখার কারণে বর্ষায় তা আবার নদীতে গড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রকল্পের মোট কাজের ২৫–৩০ শতাংশের বেশি অগ্রগতি হয়নি। অথচ ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় সম্পূর্ণ বরাদ্দ খরচ দেখানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর যেসব স্থানে ১০ ফুট গভীরতা ও ৩০০ ফুট প্রশস্ত করার কথা ছিল, সেখানে অনেক জায়গায় এখনও হাঁটু সমান পানি দেখা যায়। ফলে নৌযান চলাচল তো দূরের কথা, অনেক জায়গায় নদী প্রায় খাল বা পুকুরের মতো হয়ে গেছে।

ময়মনসিংহ নগরীর কাচিঝুলি, শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে নদীর বুকজুড়ে জেগে উঠেছে চর। কোথাও নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি ও স্থাপনা।

পরিবেশবিদদের মতে, শুধু খনন প্রকল্প নিলেই নদী বাঁচানো সম্ভব নয়। নদী দখল, অবৈধ স্থাপনা ও পলি জমার সমস্যার সমাধান না করলে ব্রহ্মপুত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

এক পরিবেশকর্মী বলেন, প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নদীর বাস্তব অবস্থা বদলায়নি। বরং অনেক জায়গায় নদী আরো সরু হয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, নদী খননের কাজ চলমান রয়েছে, তবে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে। স্থানীয় বাধা, নদীর পলি জমা ও পানির স্বল্পতার মতো বিষয়ও কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে বলে দাবি তাদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিকভাবে নদী ব্যবস্থাপনা না হলে ভবিষ্যতে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক ব্রহ্মপুত্র নদ কেবল মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

এদিকে ময়মনসিংহ নগরীতে ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ও টাউন প্রোটেকশন বাঁধের বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন ধরে দখলের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় নাগরিক সংগঠন ও বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ দখলকৃত এলাকাগুলো হলো- কালীবাড়ি পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় নদীর তীর দখল করে দোকান, ঘরবাড়ি ও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কিছু স্থানে নদীর তীরের ওয়াকওয়ে পর্যন্ত দখল করা হয়েছে।

কাছারি ফেরিঘাট এলাকায় নদীর তীরের জমিতে বিভিন্ন দোকান ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ র‌য়ে‌ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

শম্ভুগঞ্জ সেতু সংলগ্ন তীরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নদীর বাঁধের উপর ঘর ও দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। স্ক্র্যাপ ও ভাঙারি ব্যবসার কারণে হাঁটার রাস্তা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। কালীবাড়ি টাউন প্রোটেকশন বাঁধ এলাকায় নদীর বাঁধের উপর স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে। অবৈধ নির্মাণের কারণে নদীর তীর সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে।

পুরাতন গুদারাঘাট এলাকায় নদীর তীরে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এতে নদী সংকুচিত হওয়া ও দূষণ বাড়ছে। কাচিঝুলি ও শহরের বিভিন্ন ঘাটে নদীর বুকজুড়ে চর জেগে উঠেছে। নদীর তীর দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ময়মনসিংহ জেলায় নদী ও খালের জমিতে দুই হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় এক হাজার ৫০০টি অবৈধ স্থাপনা ময়মনসিংহ সদর উপজেলাতেই।