শরতেও ঝালকাঠিতে জমজমাট নৌকার বেচাকেনা

বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের কাছে নৌকাই হয়ে ওঠে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। তারা শতবর্ষী এই হাট থেকে কম দামে নৌকা কিনে নিয়ে যান।

ঝালকাঠি প্রতিনিধি

Location :

Jhalokati
হাটে বিক্রির জন্য সারিবদ্ধভাবে নৌকা সাজানো হয়েছে
হাটে বিক্রির জন্য সারিবদ্ধভাবে নৌকা সাজানো হয়েছে |নয়া দিগন্ত

শরৎ কালেও ঝালকাঠির সীমান্তবর্তী এলাকার ঐতিহ্যবাহী আটঘর হাটে চলছে কাঠের নৌকার জমজমাট বেচাকেনা। শতবর্ষের পুরোনো এই হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। বর্ষাকেন্দ্রিক এ হাটে প্রতিদিনই কয়েকলাখ টাকার নৌকা ও বৈঠার বেচাকেনা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাটজুড়ে সারি সারি নৌকা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কারিগর ও ব্যবসায়ীরা পাইকারি ও খুচরা—উভয় পদ্ধতিতেই নৌকা বিক্রি করছেন। ছোট আকারের ডিঙি নৌকা থেকে শুরু করে বড় আকৃতির মালবাহী নৌকাও বিক্রি হচ্ছে এখানে।

ব্যবসায়ীরা জানান, কাঠের মান, নকশা ও আকারের ওপর ভিত্তি করে নৌকার দাম নির্ধারণ করা হয়। সাধারণ মানের নৌকার দাম তুলনামূলক কম হলেও উন্নতমানের কাঠ দিয়ে তৈরি নৌকার দাম কিছুটা বেশি। প্রতিটি নৌকার দাম তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি প্রতিটি বৈঠার মানভেদে দেড়শ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, পেয়ারা, আমড়া, শাকসবজিসহ অন্য কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এসব নৌকার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের কাছে নৌকাই হয়ে ওঠে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে আসা এক ক্রেতা বলেন, বর্ষার সময় মাঠে গবাদিপশু নামানো সম্ভব হয় না। তখন জমি থেকে ঘাস কেটে নৌকায় করে বাড়িতে নিয়ে যেতে হয়। বছরের প্রায় ছয় মাস কৃষিকাজে নৌকার প্রয়োজন হয়।

আটঘরের হাটের ইজারাদার মো: ইকবাল হাওলাদার জানান, বর্ষা মৌসুমে এ হাটে তিন থেকে চার হাজার নৌকা কেনাবেচা হয়। প্রতিবছর এই নৌকার হাট থেকে সরকার কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে।

নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের চামি গ্রামের নৌকা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, মো: কবির, আব্দুর রহিম, মো: কাইয়ুম, মো: মালেক ও মো: শাহাবুদ্দিন জানান, বংশপরম্পরায় তারা এই পেশার সাথে যুক্ত। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় কম খরচে নৌকা তৈরি করে তুলনামূলক কম দামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা সম্ভব হয়।

তারা আরো জানান, বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করেই তাদের ব্যবসার মূল সময় শুরু হয়। বছরের এই সময়টিতে পরিবার-পরিজন সবাই মিলে নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী আটঘর হাট শুধু একটি বেচাকেনার কেন্দ্র নয়, এটি এ অঞ্চলের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের পরও গ্রামীণ জনপদের মানুষের কাছে কাঠের নৌকার আবেদন এতটুকুও কমেনি। বরং বর্ষা এলেই আটঘর হাট আবারো ফিরে পায় তার চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য।