পথে ঘুরে বাঁশির সুরে গফুরের জীবনের ৪০ বছর

সারা বছরই বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাঁশি বিক্রি করেন গফুর। বাড়িতে বাঁশ কেটে বাঁশি তৈরি করেন তার স্ত্রী জমিলা বেগম। তৈরি করা সেই বাঁশি নিয়ে ট্রেনে চড়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছুটে চলেন তিনি।

Location :

Naogaon
বাঁশিতে সুর তুলছেন আবদুল গফুর কাজী
বাঁশিতে সুর তুলছেন আবদুল গফুর কাজী |নয়া দিগন্ত

বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি
কোথাও মেলা, কোথাও হাট-বাজার, কখনো রেলস্টেশন কিংবা পাড়া-মহল্লা—হাতে বাঁশের তৈরি বাঁশি আর ঠোঁটে মায়াবী সুর। দূর থেকেই ভেসে আসে বাঁশির সুর। সেই সুর যেন জানান দেয়—গফুর এসেছেন। চার দশক ধরে এভাবেই পথে পথে ঘুরে বাঁশি বিক্রি করে জীবনের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন আবদুল গফুর কাজী।

বয়স এখন প্রায় ৬৫। জীবনের প্রায় ৪০টি বছর কেটে গেছে বাঁশির সুরের সাথে। বাবা ফরাশ উদ্দিন কাজীও ছিলেন বাঁশিওয়ালা। মেলায়-মেলায়, গ্রামগঞ্জে ঘুরে বাঁশিতে সুর তুলে তা বিক্রি করতেন তিনি। বাবার হাত ধরেই বাঁশির সাথে গফুরের পরিচয়। তবে জীবনের শুরুটা হয়েছিল অন্যভাবে। একসময় যাত্রাদলে অভিনয় করতেন তিনি। পরে ২০ বছর বয়সে যাত্রার মঞ্চ ছেড়ে বাবার পেশাকেই নিজের জীবনের সঙ্গী করে নেন।

সম্প্রতি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার থানার মোড়ে রকির দোকানের সামনে বসে কথা হয় গফুর কাজীর সাথে। এর আগে উপজেলা চত্বর, বদলগাছী সরকারি মহাবিদ্যালয় ও কলেজ গেটের মোড়ে বাঁশি বিক্রি করেছেন তিনি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছেন, আর তার বাঁশির সুরে থমকে দাঁড়িয়েছেন পথচারীরা।

গফুর জানান, সারা বছরই বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাঁশি বিক্রি করেন তিনি। বাড়িতে বাঁশ কেটে বাঁশি তৈরি করেন তার স্ত্রী জমিলা বেগম। তৈরি করা সেই বাঁশি নিয়ে ট্রেনে চড়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছুটে চলেন তিনি। কোনো নির্দিষ্ট দোকান নেই, নেই স্থায়ী বাজার। তার দোকান যেন চলন্ত—যেখানে সুরের টান, সেখানেই তার বসতি।

শুধু বাঁশি বিক্রি করাই নয়, বাঁশির সুরেরও এক অসাধারণ জাদু রয়েছে গফুরের হাতে। কয়েক হাজার গানের সুর তার আয়ত্তে। যে কোনো গান শুনে মাত্র দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই বাঁশিতে সেই সুর তুলে ফেলতে পারেন। পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, বিচ্ছেদ কিংবা পুরোনো বাংলা ও হিন্দি সিনেমার গান—সবই যেন তার বাঁশির ভাষায় কথা বলে।

তবে সময় বদলেছে। বদলে গেছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। একসময় বাঁশির কদর ছিল বেশি। এখন হাতে হাতে স্মার্টফোন, কানে হেডফোন আর চোখের সামনে ডিজিটাল বিনোদনের অঢেল আয়োজন। ফলে আগের মতো বাঁশির ক্রেতা পাওয়া যায় না।

গফুর বলেন, ‘আগে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকার বাঁশি বিক্রি হতো। এখন বিক্রি অনেকটাই কমেছে। তবে গ্রাম ও শহরের মেলা এলে চিত্রটা কিছুটা বদলে যায়। বিশেষ করে বৈশাখী মেলায় বাঁশির চাহিদা আগের তুলনায় বাড়ে।’

মেলায় শিশু-কিশোরদের হাতে বাঁশি উঠলে গফুরের চোখেমুখেও যেন ফিরে আসে পুরোনো দিনের আনন্দ।

তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি ছিল করোনাকালের বিধিনিষেধ। মানুষের চলাচল বন্ধ, মেলা বন্ধ, হাট-বাজারে মানুষের সমাগম কম—সব মিলিয়ে থমকে গিয়েছিল তার জীবিকার পথ। বাঁশি হাতে বের হওয়ার সুযোগও ছিল সীমিত। তবু জীবনের প্রয়োজনে সুরকে আঁকড়ে ধরেই টিকে ছিলেন তিনি।

বাবার হাত ধরে যে পেশায় এসেছিলেন গফুর, সেই পেশায় সন্তানদের আনেননি। তার তিন ছেলে। তারা পোশাক কারখানায় কাজ করেন। গফুরের ভাষায়, বাঁশির প্রতি ভালোবাসা থাকলেও এ পেশায় জীবিকা নির্বাহ করা এখন কঠিন। তাই সন্তানদের জন্য তিনি অন্য পথ বেছে নিতে চেয়েছেন।

চার দশকের পথচলায় গফুরের কাছে বাঁশি এখন আর নিছক বিক্রির পণ্য নয়; এটি তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আত্মার সাথে বাঁশির সুর মিশে আছে। আত্মা যেদিন থাকবে না, সেদিন হয়তো আমার কণ্ঠের সুরও থেমে যাবে। একদিন আমি হয়তো থাকব না, তবে আমার ছড়ানো সুরের মাঝে সংগীতপ্রেমীরা খুঁজে পাবে আমাকে।’

গফুরের বাঁশির সুরে মুগ্ধ সংগীতপ্রেমী শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘গ্রাম-বাংলার হারানো দিনের ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ বাঁশের বাঁশি। ডিজিটালের ভিড়ে এই শিল্প দিন দিন প্রায় বিলুপ্তির পথে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। সহায়তা পেলে গফুরের মতো বাঁশিওয়ালারা আরো দীর্ঘদিন সংগীতপ্রেমীদের মাঝে সুর ছড়িয়ে যেতে পারবেন।’

বদলগাছীর কোনো এক ব্যস্ত মোড়ে হয়তো আবারো শোনা যাবে বাঁশির সেই পরিচিত সুর। মানুষ ছুটে যাবে, কেউ কিনবে বাঁশি, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে শুনবে। আর গফুর? তিনি হয়তো পরের গন্তব্যের পথে হাঁটবেন—কাঁধে বাঁশির ঝুলি, ঠোঁটে সুর আর চার দশকের স্মৃতি সাথে নিয়ে।

ডিজিটালের এই দ্রুতগতির সময়ে তার বাঁশির সুর হয়তো আগের মতো মানুষ টানে না। তবু সেই সুরে বেঁচে আছে গ্রামবাংলার এক পুরোনো গল্প, এক হারিয়ে যেতে বসা পেশা, আর একজন মানুষের চার দশকের জীবনসংগ্রাম।