সুনামগঞ্জে পানির নিচে বোরো ধান, ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কা

প্রাথমিক হিসাবে, অতিবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে জলাবদ্ধতায় আরও ২ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, সুনামগঞ্জ

Location :

Sunamganj

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে বোরো ধানের ক্ষেত। এতে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও স্থানীয়দের আশঙ্কা, ৫০০ কোটি টাকার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ১২ উপজেলায় ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ হাওর এখন পানিতে নিমজ্জিত।

প্রাথমিক হিসাবে, অতিবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে জলাবদ্ধতায় আরও ২ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

জেলায় মোট আবাদকৃত জমির মধ্যে হাওর এলাকায় রয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং উঁচু এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। রোববার পর্যন্ত হাওরে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর এবং অন্যান্য এলাকায় ১৫ হাজার হেক্টর ধান কাটা হয়েছে। গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের। তবে কৃষকদের মতে, প্রকৃতপক্ষে এর হার ৫০ শতাংশের বেশি নয়।

ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে হাওরে প্রবেশ করছে। এতে নিমজ্জিত হচ্ছে পাকা ও আধাপাকা ধান। প্রতিকূল আবহাওয়া, পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাইরের জেলা থেকে শ্রমিকরা কাজে আসতে অনীহা দেখাচ্ছেন।

হাওরে জমে থাকা পানির কারণে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কৃষকরা নৌকা ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। তবে অনেক ক্ষেতেই তা সম্ভব হচ্ছে না।

জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনা হাওরের কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী বলেন, “কষ্ট করে আবাদ করা জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। কিছু জমিতে কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছি, বাকিটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংসার চালানো, শ্রমিকের মজুরি—সবকিছু নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”

একই উপজেলার কৃষক এনায়েত কবির খান বলেন, “শ্রমিক সঙ্কট, যন্ত্র ব্যবহার না করতে পারা এবং আবহাওয়ার কারণে অনেক জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। যে ধান কাটা হয়েছে, সেটিও শুকাতে না পারায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় জেলার ৫৩টি হাওরে ৬০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছিল। এ জন্য ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও পাওয়া গেছে ৬৭ কোটি টাকা। এছাড়া চলতি মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও রোদ না থাকায় ধান শুকাতে না পারায় কৃষকের ক্ষতি বাড়ছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হলে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা হাওর এলাকায় পরিস্থিতি পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।