দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কগুলো বিপজ্জনক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠছে। গত দেড় বছরে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। দুর্ঘটনার সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা-ভাঙ্গা-পটুয়াখালী মহাসড়ক (এন-৮)।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। পর্যটন নগরী সিলেটকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা এ মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। ব্যস্ততার পাশাপাশি এটি দুর্ঘটনার দিক থেকেও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়কের একটি।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুর্ঘটনার সংখ্যায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক (এন-২)। এ মহাসড়কে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৭৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে (এন-১) ২২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
দুর্ঘটনার সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা-ভাঙ্গা-পটুয়াখালী মহাসড়ক (এন-৮)। এ মহাসড়কে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৯৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এই সময়ে ঢাকা-বগুড়া-বাংলাবান্ধা মহাসড়কে (এন-৫) ৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গোপালগঞ্জ-খুলনা মহাসড়কে (এন-৮০৫) ৪৬টি, কাশিনাথপুর-পাবনা-রাজশাহী মহাসড়কে (এন-৬) ৩৮টি, দৌলতদিয়া-খুলনা-যশোর-মোংলা মহাসড়কে (এন-৭) ৩২টি এবং ঢাকা-গাজীপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কে (এন-৩) ৩১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-১৬০) এবং জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়কে (এন-৪) ১৯টি করে দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মহাসড়কে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের নকশা ও অবকাঠামোগত ত্রুটি, চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানোর কারণে ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ, অনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অন্যতম। পাশাপাশি মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল এবং তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর কারণেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি চালকদের আচরণ ও যানবাহন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে সরকার দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সড়কের জ্যামিতিক উন্নয়ন, সড়ক সরলীকরণ, সাইন-সিগন্যাল ও রোড মার্কিং স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
পাশাপাশি গার্ডরেল, ডেলিনিয়েটর, স্পিড ব্রেকার ও সাইনবোর্ডের মতো রোড ফার্নিচার স্থাপন এবং পথচারীদের নিরাপত্তায় বাজার ও জনবহুল এলাকায় ওভারপাস, ফুটওভারব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং ও সার্ভিস রোড নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক ও অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক আরমানা সাবিহা হক বলেন, ‘মহাসড়ক ফাঁকা থাকলে অনেক চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। আবার অনেক বাসচালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণও নেই। এর সঙ্গে সড়কের অবকাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা যুক্ত হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।’
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দুর্ঘটনার তথ্য ভবিষ্যতের সড়ক নির্মাণ ও বড় প্রকল্প পরিকল্পনায় কাজে লাগাতে হবে।’



