বাবার স্বপ্নপূরণ

বাবা ছিলেন এমপি, ছেলে হলেন প্রতিমন্ত্রী

ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেনের জন্ম গৌরীপুর উপজেলার সিধলা ইউনিয়নের তাতরাকান্দা গ্রামে। তার বাবা ইসমাইল হোসেন তালুকদার ছিলেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের রাজনীতিবিদ। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাবার সেই সংসদ ভবনের স্মৃতি, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দায়বদ্ধতার গল্পই ধীরে ধীরে ছেলেকে টেনে আনে রাজনীতির কঠিন পথে।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেন
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেন |নয়া দিগন্ত

রাজনীতির ময়দানে কিছু গল্প থাকে, যা কেবল ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। সেগুলো প্রজন্ম, স্মৃতি ও স্বপ্নের উত্তরাধিকার বহন করে। ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অধ্যায় তেমনই এক আবেগঘন ইতিহাসের নাম, যেখানে বাবার দেখা স্বপ্ন পূরণ করলেন ছেলে।

ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে পা রাখার পর ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেন শপথ নিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহের রাজনীতিতে যুক্ত হলো এক প্রতীকী অধ্যায়— বাবা ছিলেন এমপি, আর ছেলে হলেন প্রতিমন্ত্রী।

শেকড়ের গল্প, রাজনীতির উত্তরাধিকার :
ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেনের জন্ম গৌরীপুর উপজেলার সিধলা ইউনিয়নের তাতরাকান্দা গ্রামে। তার বাবা ইসমাইল হোসেন তালুকদার ছিলেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের রাজনীতিবিদ।

১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাবার সেই সংসদ ভবনের স্মৃতি, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দায়বদ্ধতার গল্পই ধীরে ধীরে ছেলেকে টেনে আনে রাজনীতির কঠিন পথে।

অপেক্ষার রাজনীতি, অবশেষে সাফল্য :
ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেন রাজনীতিতে হঠাৎ আসা কোনো চরিত্র নন। এর আগেও তিনি তিনবার মনোনয়ন পেয়েছেন। কখনো হার, কখনো মামলা, কখনো রাজনৈতিক প্রতিকূলতা— সব পেরিয়ে এবার তিনি শুধু এমপি নন, সরাসরি প্রতিমন্ত্রী।

ময়মনসিংহ-৩ আসনে তিনি পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৩২০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণ পেয়েছেন ৬৫ হাজার ৯৯৫ ভোট। এই ব্যবধান শুধু ভোটের নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধৈর্যের প্রতিফলন।

মামলা, আন্দোলন ও প্রত্যাহারের অধ্যায় :
রাজনীতির পথ কখনো মসৃণ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ছিল পাঁচটি রাজনৈতিক মামলা। ২০১৩ সালে গৌরীপুরে আন্তঃনগর ট্রেনে হামলার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক আইনে একাধিক মামলা হয়। পরে রাজনৈতিক বিবেচনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এসব মামলা প্রত্যাহার করা হয়। এই অধ্যায় তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্ক যেমন তৈরি করেছে, তেমনি তৈরি করেছে সহানুভূতি ও সমর্থনের শক্ত ভিত।

গৌরীপুরের প্রতিমন্ত্রীর স্মৃতি :
গৌরীপুরবাসীর কাছে ‘প্রতিমন্ত্রী’ শব্দটি নতুন নয়। এর আগে আওয়ামী লীগের ডা: ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) মজিবুর রহমান ফকির ২০০৯-১৪ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ১২ বছর পর আবারো এই আসন থেকে একজন প্রতিমন্ত্রী পাওয়ায় এলাকায় ফিরে এসেছে রাজনৈতিক গর্ব ও প্রত্যাশা।

ইতিহাসের পাতায় ময়মনসিংহ-৩ :
এই আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস বৈচিত্র্যময়। ১৯৭৯ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি ও একাধিকবার আওয়ামী লীগ এখানে বিজয়ী হয়েছে। ২০০৮ সালে ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেন বড় ব্যবধানে পরাজিত হলেও সেই হারই যেন তার রাজনৈতিক দৃঢ়তার ভিত্তি গড়ে দেয়।

শেষ কথা :
বাবার হাত ধরে সংসদের স্বপ্ন দেখা এক তরুণের দীর্ঘ পথচলার শেষ হয়নি; বরং নতুন দায়িত্বে শুরু হলো আরেক অধ্যায়। ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আজ শুধু একজন প্রতিমন্ত্রী পায়নি; পেয়েছে এক প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, যেখানে স্মৃতি, সংগ্রাম ও স্বপ্ন এক সুতোয় গাঁথা।

এই গল্প কেবল একজন মানুষের উত্থানের নয়; এটি গৌরীপুরের রাজনীতির আত্মকথা।