দেড় মাস পর দেশে ফিরল ঘিওরের লুৎফরের লাশ

বাবার কাঁধে সন্তানের শেষ বিদায়

বিদেশ যাওয়ার জন্য নেয়া প্রায় ছয় লাখ টাকার ঋণ এখন তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

Location :

Ghior
নিহত প্রবাসী লুৎফর মিয়া, (ডানে) শোকে মূর্ছা গেছেন স্বজনরা
নিহত প্রবাসী লুৎফর মিয়া, (ডানে) শোকে মূর্ছা গেছেন স্বজনরা |নয়া দিগন্ত

শেষ ভরসাটুকু ফিরল, কিন্তু জীবিত নয় নিথর দেহ হয়ে। বাবার কাঁধে উঠল সন্তানের লাশ, আর সেই দৃশ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো গ্রাম। দীর্ঘ এক মাস ২২ দিনের অপেক্ষার পর সৌদি আরব থেকে প্রবাসী লুৎফর মিয়ার লাশ দেশে পৌঁছেছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার সিংজুরী ইউনিয়নের সিংজুরী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার লাশ দেশে পৌঁছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩৭ বছর বয়সী লুৎফর মিয়া। ধারদেনা করে সংসারের অভাব ঘোচাতে ও স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় প্রায় এক বছর আগে বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু পরিবারের সেই স্বপ্ন আজ থেমে গেছে চিরতরে।

লুৎফর মিয়া ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। চার বছর আগে করাতকলের গাছের গুঁড়ি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে পড়েন তার বড় ভাই আব্দুল আওয়াল। এরপর থেকে বৃদ্ধ বাবা-মা, পঙ্গু ভাই, স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানের পুরো দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে।

জানাজার সময় ছেলের লাশ কাঁধে তুলে নিতে গিয়ে ভেঙে পড়েন বাবা মজনু মিয়া। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবার কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী কিছু নাই। এই কষ্ট কেউ বুঝবে না। যে হারায়, সেই জানে’

নিহতের স্ত্রী নার্গিস আক্তার দুই শিশুকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমার স্বামীই ছিল আমাদের সব। দুইটা ছোট বাচ্চা নিয়ে আমি এখন সম্পূর্ণ অসহায়। থাকার মতো ঠিকঠাক ঘর নাই, মাথার ওপর ঋণের বোঝা। উনি বেঁচে থাকলে সব সামলাতে পারতেন। এখন আমি কোথায় দাঁড়াবো, কিভাবে বাচ্চাগুলারে মানুষ করব।’

পঙ্গু বড় ভাই আব্দুল আওয়াল কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি তো চলতে পারি না, কিছু করতে পারি না। আমার ছোট ভাইটাই ছিল আমাদের ভরসা। সে আমাদের জন্য নিজের জীবনটা বিদেশে কাটাইতেছিল। আজ সে লাশ হয়ে ফিরল। আল্লাহ কেন আমারে নিলো না, ওরে নিলো!

পরিবারের সদস্যরা জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য নেয়া প্রায় ছয় লাখ টাকার ঋণ এখন তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী অংশ নেন। এ সময় সিংজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু মো: আসাদুর রহমান মিঠু বলেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে থাকি, এই পরিবারের পাশে থাকব।’ এ সময় তিনি লুৎফর মিয়ার দুই সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণাও দেন।

স্থানীয়দের দাবি, প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আরো কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি অসহায় এ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।