তাহিরপুরে শেষ হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ, উৎকণ্ঠায় কৃষক

বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়ায় এক ফসলি বোরো ধান নিয়ে আগাম বন্যার আশঙ্কায় হাওরপাড়ের কৃষকরা উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক তোজাম্মিল হক নাসরুম।

মেহেদী হাসান ভূঁইয়া, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)

Location :

Tahirpur
তাহিরপুরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফসলরক্ষা বাঁধের শেষ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে
তাহিরপুরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফসলরক্ষা বাঁধের শেষ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে |নয়া দিগন্ত

মেহেদী হাসান ভূঁইয়া, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)

কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা থাকলেও সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় এখনো শেষ হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ। অনেক বাঁধে এখনো মাটির কাজসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।

এ নিয়ে হাওরপাড়ের কৃষকরা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। পাশাপাশি বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন কৃষক, সচেতন মহল ও বাঁধ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর নেতারা। উপজেলার বিভিন্ন হাওরে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে দাবি করেছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলন, হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলায় ছোট-বড় ২৩টি হাওরে এ বছর মোট ৮৮টি পিআইসির বিপরীতে প্রায় ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বছর বরাদ্দ ছিল ১৩ কোটি টাকা। অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ায় সচেতন মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর উপজেলার ২৩টি ছোট-বড় হাওরে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত সবচেয়ে বেশি। এ উপজেলায় প্রায় তিনশ কোটি টাকার বেশি ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়ায় এক ফসলি বোরো ধান নিয়ে আগাম বন্যার আশঙ্কায় হাওরপাড়ের কৃষকরা উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক তোজাম্মিল হক নাসরুম।

তিনি বলেন, “আমরা দিনভর বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখেছি, বাঁধের কাজ সন্তোষজনক নয়। সঠিকভাবে কাজ শেষ না হওয়ায় দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতাই দায়ী।”

তিনি আরও বলেন, “পিআইসির দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তারা কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল উত্তোলনের চেষ্টা করছেন। বোরো ফসল রক্ষায় দ্রুত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।”

কৃষক রাজু আহমেদ জানান, বাঁধে অনিয়মের অভিযোগ দিলে দায়িত্বশীলরা শুনেও না শোনার ভান করেন। অথচ হাওরের এক ফসলি জমি পুরোপুরি বাঁধের ওপর নির্ভরশীল। বাঁধ ভেঙে গেলে হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

শনির হাওরের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, “এবার ধান ভালো হওয়ার আশা করছি। কিন্তু ধান রক্ষার জন্য যে বাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে, তা এখনো শেষ হয়নি। ধান পানিতে তলিয়ে গেলে আমরা পরিবার নিয়ে কোথায় যাব?”

মাটিয়ান হাওরের কৃষক শাকিল মিয়া বলেন, “বোরো ধানই আমাদের জীবন-জীবিকার মূল হাতিয়ার। প্রতি বছরের মতো এবারও আশায় চাষাবাদ করেছি। কিন্তু ঠিকমতো বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় প্রতি বছরই ফসলডুবির আশঙ্কায় থাকতে হয়।”

৮১ নম্বর পিআইসির দায়িত্বে থাকা রায়হান উদ্দিন জানান, তার দায়িত্বাধীন বাঁধের কাজ প্রায় শেষ। অবশিষ্ট কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক মিলন অভিযোগ করে বলেন, পিআইসি গঠন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হয়েছে। অনেক জায়গায় পুরোনো মাটি ঘষামাজা করে ব্যবহার করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজারগুলোতে দেরিতে কাজ শুরু হয়েছে। এমনকি অনেক পিআইসির সদস্য-সচিব নিজের দায়িত্ব সম্পর্কেও অবগত নন; তাদের নাম ব্যবহার করে অন্যরা কাজ করছেন।

তিনি আরে বলেন, মধ্যনগর, ধর্মপাশা, শাল্লা, দিরাই, জগন্নাথপুর, শান্তিগঞ্জ ও দোয়ারাবাজারসহ বিভিন্ন উপজেলার ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের অবস্থা নাজুক। অনেক অপ্রয়োজনীয় পিআইসি গঠন করা হয়েছে।

নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ফসলি জমি, কান্দা (হাওরের উঁচু জায়গা) ও সংরক্ষিত এলাকা থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করায় প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

তাহিরপুর উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসও মনির হোসেন বলেন, “২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মাটির কাজ শেষ হবে, তবে অন্যান্য কাজ শেষ নাও হতে পারে। কারণ পিআইসিদের এখন পর্যন্ত ২৫ শতাংশ টাকা দেওয়া হয়েছে। অর্থের স্বল্পতার কারণে কাজের গতি ধীর।”

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “এ পর্যন্ত বোরো চাষাবাদে কোনো সমস্যা নেই। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।”