হারিয়ে যেতে বসা ‘পাপরা’ এখনো তৈরি হচ্ছে গ্রামে, ফিরছে পুরোনো ঐতিহ্য

নব্বইয়ের দশকেও বিয়ের কয়েক দিন আগে বাড়ির নারীরা একসাথে বসে পাপরা তৈরি করতেন। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও এতে অংশ নিতেন।

Location :

Netrokona
পাপরা তৈরি করছেন গ্রামের এক নারী
পাপরা তৈরি করছেন গ্রামের এক নারী |নয়া দিগন্ত

মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা
একসময় গ্রামবাংলার বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই ছিল নানা ধরনের দেশীয় আচার-অনুষ্ঠান ও হাতে তৈরি সামগ্রীর আয়োজন। এরই অংশ ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘পাপরা’। নব্বইয়ের দশকেও গ্রামের নারীরা নিজেদের হাতে পাপরা তৈরি করতেন।

বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার ছিল বেশ প্রচলিত। সময়ের পরিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়া ও তৈরি সামগ্রীর সহজলভ্যতায় সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।

তবে বিলুপ্তপ্রায় সেই গ্রামীণ ঐতিহ্যের ‘পাপরা’ এখনো যে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তারই দেখা মিলেছে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার (পানুর) গ্রামের একটি বাড়িতে। সম্প্রতি ওই বাড়িতে কয়েকজন নারীকে নিজেদের হাতে পাপরা তৈরি করতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন পর গ্রামে এমন দৃশ্য দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আগ্রহ ও কৌতূহল।

স্থানীয় প্রবীণ নারীরা জানায়, নব্বইয়ের দশকেও বিয়ের কয়েক দিন আগে বাড়ির নারীরা একসাথে বসে পাপরা তৈরি করতেন। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও এতে অংশ নিতেন। পাপরা তৈরির সময় নারীদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। এটি শুধু একটি সামগ্রী তৈরির কাজ ছিল না; বরং এর সাথে জড়িয়ে ছিল গ্রামীণ নারীদের সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আনন্দ।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে গ্রামের জীবনযাত্রা। হাতে তৈরি এসব ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর জায়গা দখল করেছে বাজারের তৈরি পণ্য। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এসব তৈরির পদ্ধতি জানে না। ফলে একসময় ঘরে ঘরে দেখা গেলেও বর্তমানে পাপরা তৈরির দৃশ্য খুবই বিরল।

স্থানীয়রা বলছেন, এখন কোনো বাড়িতে পাপরা তৈরি করতে দেখা গেলে সেটি অনেকটা পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার মতো। প্রবীণদের কাছে এটি নস্টালজিয়ার বিষয় হলেও নতুন প্রজন্মের কাছে এটি হয়ে উঠেছে কৌতূহলের বিষয়।

স্থানীয় এক নারী বলেন, আগে বিয়ের সময় বাড়ির মেয়েরা সবাই মিলে পাপরা বানাত। এখন এসব আর তেমন দেখা যায় না। অনেক বছর পর আবার বাড়িতে পাপরা তৈরি করতে পেরে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে।

সচেতন মহলের মতে, গ্রামবাংলার এমন ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প শুধু একটি পুরোনো প্রথা নয়, এগুলো আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের অংশ। তাই পাপরার মতো হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

নতুন প্রজন্মকে এসব তৈরির কৌশল শেখানো গেলে একদিকে যেমন পুরোনো ঐতিহ্য টিকে থাকবে, অন্যদিকে গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি আয়েরও একটি মাধ্যম হতে পারে।

হারিয়ে যেতে বসা ‘পাপরা’ তাই শুধু একটি তৈরি সামগ্রী নয়—এর সাথে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার নারীদের স্মৃতি, বিয়ের আনন্দ আর একসময়ের প্রাণবন্ত সামাজিক জীবন। একটি বাড়িতে আবার পাপরা তৈরির দৃশ্য যেন সেই হারানো ঐতিহ্যকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।