জুলাই আন্দোলনে হামলা

রিমির বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার চায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাদি ও বিএনপির ক্ষোভ

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হামলার ঘটনায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী সিমিন হোসেন রিমির বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মোহাম্মদ আলী ঝিলন, গাজীপুর

Location :

Gazipur
সিমিন হোসেন রিমি
সিমিন হোসেন রিমি |ফাইল ছবি

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ৪ আগস্ট গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হামলার ঘটনায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী সিমিন হোসেন রিমির বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

জেলা কমিটি থেকে এ সংক্রান্ত সুপারিশ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের চিঠির কপি কাপাসিয়ায় পৌঁছালে মামলার বাদি ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য নিরাপত্তা বিভাগের আইন ১ শাখার সহকারী সচিব মো: মফিজুল ইসলামের গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন থানার রাজনৈতিকভাবে দায়েরকৃত ১১৯টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪৯৪ ধারার আওতায় মামলা প্রত্যাহার বিষয়ে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে যে, সরকার ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪৯৪ ধারার আওতায় গাজীপুর জেলার মামলাসমূহ প্রসিকিউশন না চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৯৪ ধারার আওতায় উক্ত মামলাগুলো প্রত্যাহার করার লক্ষ্যে গাজীপুর জেলা পাবলিক প্রসিকিউটরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

উক্ত চিঠির ১৬ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে কাপাসিয়া থানার মামলা নাম্বার ২৩। তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর/২৪। মামলার ধারা ১৪৩/৪৪৮/৩২৩/৩২৬/৪৩৫/৪৩৬/৪২৭/১১৪ পেনাল কোড তৎসহ ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের ৩/৪ ধারা।

গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর কাপাসিয়া থানায় মামলাটি দায়ের করেন উপজেলার তরগাঁও গ্রামের মৃত আব্দুল গনির ছেলে জুনায়েদ হোসেন লিয়ন। তিনি কাপাসিয়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী যুবদলের সদস্য সচিব।

এ মামলায় এক নাম্বার হুকুমের আসামি করা হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সীমিন হোসেন রিমিকে। মামলায় রিমির সাথে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ-ছাত্রলীগের আরো ৬১ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় তারা আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সংক্রান্তে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের আইন ১ শাখা একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সদস্য পুলিশ সুপার/উপ পুলিশ কমিশনার, পাবলিক প্রসিকিউটরকে সদস্য এবং অতিক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ কমিটি যাচাই বাছাই করে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু এ কমিটি উক্ত মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ পাঠায়নি বলে জানা গেছে।

কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহ রিয়াজুল হান্নান বলেন, ‘এটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলা। এটি প্রত্যাহারের কোনো সুপারিশ করা হয়নি। তারপরেও কিভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের তালিকায় মামলাটি এলো তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা এ ঘটনায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ।’

এ বিষয়ে গাজীপুরের পাবলিক প্রসিকিউটর মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এ মামলাটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের উপর হামলার কারণে দায়ের করা হয়েছে। এটি ৫ আগস্টের পরের মামলা। আমরা জেলা থেকে এ মামলাটি প্রত্যাহারের সুপারিশ পাঠাইনি। একারণে এ মামলা প্রত্যাহারের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বিষয়টি ইতোমধ্যে আদালতকে অবহিত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও জানানো হবে।’

এ বিষয়ে জেলা কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন জানান, ‘এ মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য আমাদের কাছ থেকে কোনো সুপারিশ পাঠানো হয়নি।’

মামলায় সিমিন হোসেন রিমি ছাড়াও অন্য আসামিরা হলো, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম সেলিম ও সাবেক সভাপতি মো: শহিদুল্লাহ, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো: আমানত হোসেন খান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: মিজানুর রহমান প্রধান, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ ও মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ সেলিম, যুবলীগের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন প্রধান, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজিব ঘোষ, ইমানুল্লাহ শেখ ইমু, মাহমুদুল হাসান মামুন, আমীর হামজা, মাহবুব আলম মোড়ল, আফসার উদ্দিন, রেজাউল করিম লস্কর মিঠু, ইকবাল মাহমুদ খান, সালাউদ্দীন লঙ্কর শ্যামল, মো: লিখন করাচী, ইসমাইল হোসেন মিজান, মো: জিয়াউর রহমান জিয়া, আয়ুবুর রহমান সিকদার, মো: শাহ আলম ছিদ্দিকী, আতাউজ্জামান বাবলু, মো: কামাল হোসেন হান্নান, মো: মিজানুর রহমান সরকার, এম এ ওহাব খান খোকা, রাকিব প্রধান, মো: শফিকুল হাকিম মোল্লা (হিরণ), মো: মস্তফা কামাল (বাদল মোল্লা), মো: সামসুল হুদা (লাল মিয়া), মো: বজলুর রহমান চান মিয়া, এম এ জলিল।

মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাবেক সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমির নির্দেশে আসামিরা উপজেলার ফকির মজনুশাহ সেতু এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনায় কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এ সময়ে কাপাসিয়া সেন্ট্রাল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষিকা শামীমা চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি ফকির মজনু শাহ সেতুর পশ্চিম পাশে পৌঁছলে অভিযুক্ত আসামিরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। আসামিদের সাথে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র হতে গুলি ছুড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ওই সময় আসামিরা মারপিট করে আল-আমিন হোসেন সোহাগকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে এবং মো: ফরিদ শেখকে হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। ফরহাদ হোসেনকে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া আরো ১০/১৫ জন গুরুতর আহত হয়। আহত সকলকে উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।

এ হামলার ঘটনায় ৬১ জনের নাম এবং ১৫০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ৫/৬টি মোটরসাইকেল, সরকারি ডাক-বাংলো গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।