সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কালিগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী নুমান উদ্দিন হত্যা মামলার তদন্তে ধীর গতির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সাত মাসেও আলোচিত এ হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় পুলিশের প্রতি মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
জানা যায়, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে জকিগঞ্জ উপজেলার জনবহুল কালিগঞ্জ বাজারের নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিখোঁজ হন ব্যবসায়ী নুমান উদ্দিন। নিখোঁজের দু’দিন পর ১ অক্টোবর বিকেলে স্থানীয় শায়লা স্মৃতি হাসপাতালের পেছনের ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার লাশ।
এ ঘটনায় জকিগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত নুমান উদ্দিনের বড় মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নি। এরপর নুমান উদ্দিনের হত্যার বিচার ও আসামিদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবিতে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন এলাকাবাসী।
তখন অভিযুক্ত করা হয় নিহতের শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমন ও নুমান উদ্দিনের পরিবারকে। এ সূত্র ধরে পুলিশ একে একে পরিবারের সকল সদস্যসহ সন্দেহভাজন সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে সন্দেহজনক আসামি হিসেবে শ্যালক সুমনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারপরও জকিগঞ্জ থানা পুলিশ আলোচিত এ হত্যা মামলার কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।
এমতাবস্থায় মামলার বাদী জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ের মাধ্যমে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি মামলাটি সিআইডিতে তদন্তের জন্য হস্তান্তর করা হয়। সিআইডি বিগত তিন মাসের অধিক সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
এলাকার লোকজন জানান, ঘটনাস্থলের পাশে অবস্থিত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা শায়লা স্মৃতি হাসপাতালে শুধুমাত্র পাহারাদার তেরা মিয়া ছাড়া আর কারো কোনো যাতায়াত নেই বললেই চলে। অত্যন্ত নিরিবিলি ও ভয়ঙ্কর এই স্থানে কখনো কেউ যাতায়াত করে না। ফলে খুনিরা ব্যবসায়ী নুমান উদ্দিনকে হত্যার জন্য এমন একটি জায়গাকে বেছে নিয়েছে।
তুহিন আহমদ নামের স্থানীয় এক কিশোর জানায়, নুমান উদ্দিন নিখোঁজের দিন বেলা ১১টার দিকে সর্বশেষ তাকে শায়লা স্মৃতি হাসপাতালে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকে তাকে আর কেউ দেখেনি।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিবাদ করার পরও নুমান হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করতে না পারার ব্যর্থতা পুলিশের। নুমান উদ্দিনের স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি বাকি অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞেসাবাদ করলে হয়তো রহস্য বেরিয়ে আসত। এছাড়াও কালিগঞ্জ বাজার থেকে শায়লা স্মৃতি হাসপাতাল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় থাকা সিসি ক্যামেরার ভিডিও চিত্র সংগ্রহ এবং মুক্তিপণ দাবিকারীদের চিহ্নিত করতে পারলে সহজেই এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বের করা সম্ভব ছিল। এ ক্ষেত্রে পুলিশের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীন আচরণ লক্ষ্য করা গেছে।
নিহত নুমান উদ্দিনের স্ত্রী মনওয়ারা বেগম জানান, তার স্বামী নিখোঁজের আগের রাতে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে এক ব্যবসায়ীর সাথে বিস্কুট ক্রয় করা নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় কতিপয় লোক নুমান উদ্দিনকে চোর সাজানোর পায়তারা করে। পরে বিষয়টি পরদিন নিষ্পত্তি করে দিবেন বলে দায়িত্ব নেন গ্রামের বদুর নামের জনৈক ব্যক্তি। কিন্তু বিষয়টি নিষ্পত্তি হলো কি-না, তা তিনি স্বামীর কাছ থেকে শুনতে পারেননি।
তিনি আরো জানান, তাদের বাসার পাশের ইউনিট ছিল তার দেবর রিয়াজ উদ্দিনের। রিয়াজ প্রবাস থাকাকালে তার স্ত্রী রাবিয়া বেগম পার্শ্ববর্তী এলাকার আলম নামে এক যুবকের সাথে পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি লোকমুখে জানাজানি হলে রিয়াজ উদ্দিন তার স্ত্রী রাবেয়া বেগমকে কালিগঞ্জ বাজারে ভাড়াটিয়া বাসায় রেখে প্রবাসে চলে যান। আর এই পরকিয়া প্রেমের সম্পর্কের জেরে নুমান উদ্দিনের সাথে ভাই রিয়াজ উদ্দিনের বিরোধ শুরু হয়।
একপর্যায়ে দুই ভাইয়ের বিরোধ গড়ায় সম্পত্তি নিয়ে। বিষয়টি একাধিকবার চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সালিসে এলাকার ব্যক্তিরা সমাধানের চেষ্টা করলেও সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি। পাশাপাশি নুমান উদ্দিনের পৈত্রিক বসতবাড়ি নিয়ে তার চাচাত ভাইদের সাথেও মনোমালিন্যতা ছিল।
তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেন রিয়াজ উদ্দিন ও তার স্ত্রী রাবেয়া বেগম। তারা উল্টো অভিযোগ তোলেন, নুমান উদ্দিনের স্ত্রী মনওয়ারা বেগমের প্রতি। তাদের মতে, একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতেই এসব কাহিনী রটানো হচ্ছে। অন্যদিকে নুমান উদ্দিনের স্ত্রী মনওয়ারা বেগমের সাথে পার্শ্ববর্তী বাড়ির বাসিন্দা শিহাব উদ্দিনের পরকিয়া সম্পর্কের বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে। দাবি করা হচ্ছে, শিহাব উদ্দিনের সাথে পরকিয়া সম্পর্কের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে।
তবে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা অপপ্রচার বলে দাবি করছেন নুমান উদ্দিনের স্ত্রী মনওয়ারা বেগম। তিনি দাবি করেন, শিহাবের সাথে আমার কোনোদিন অনৈতিক সম্পর্ক দূরের কথা কোনো নরমাল সম্পর্কও ছিল না। বিষয়টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে প্রতিপক্ষের লোকজন এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিহাব উদ্দিন জানান, তাদের পারিবারিক সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারার জের ধরে তার ভাতিজা এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট ও কাল্পনিক কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করছে। প্রকৃতপক্ষে নুমান উদ্দিনের স্ত্রীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদি জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নি জানান, আমার বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি ও পুরাতন বাড়িতে আমার মায়ের ক্রয়কৃত সম্পত্তি জোর করে দখল করে রেখেছেন আমার চাচারা। এমনকি আমার বাবার জায়গায় জোরপূর্বক বিল্ডিং নির্মাণ করেছেন চাচাত ভাইরা। আমার মা-বাবা একাধিকবার এই বিষয়ে বিচারপ্রার্থী হলে তারা হয়রানি এমনকি তাদের মারপিট করেন।
তিনি আরো জানান, বর্তমানে আমাদের পুরাতন বাড়ির জায়গা নিয়ে আমার মা-বাবার সাথে চাচাদের মামলা চলমান রয়েছে। এছাড়া আমার বাবার লাশের খবর পেয়ে উনার চাচাত ভাই জামিল দেশ ত্যাগ করেছে। পারিবারিক এই বিরোধের জেরে হয়তো এ ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়াও বিস্কুট ক্রয়কে কেন্দ্র করে নিখোঁজের আগের রাতে বাবার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং বাবা নিখোঁজের পরদিন থেকে প্রতিবেশী শিহাবের ভূমিকাও সন্দেহের চোখে দেখছেন মুন্নি। তিনি মনে করেন, পুলিশ এসব বিষয়ে আন্তরিকভাবে তদন্ত করলে মূল ঘটনা দ্রুত বেরিয়ে আসবে।
সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তা মেহেরুন নেছা বলেন, আমি তদন্তভার পাওয়ার পর থেকে প্রায় সাত জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছি। অনেককে নোটিশ দিয়ে তলব করেছি। তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে। সকলের আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে ভালো ফলাফল পাবো বলে আশাবাদী।



