মেয়ের লাশ নিয়ে ‘মামলা বাণিজ্য’ ও ‘চাঁদাবাজি’, ফেঁসে গেলেন বাবা

ঈদের দিন বিকেলে তিন-চারজন লোক এসে আমার ছোট ছেলে হাসানকে ঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে। আমার ছেলে শ্রমিকের কাজ করে। তাদের দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় হাসানকে মারধর শুরু করে। এ সময় আমি ও আমার প্রতিবন্ধী নাতনি মরিয়ম বাধা দিতে গেলে তারা মরিয়মকেও মারধর করে।

জাকির হোসেন, চান্দিনা (কুমিল্লা)

Location :

Chandina
ঈদের দিন মারধরে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থলে এলাকাবাসীর ভিড়
ঈদের দিন মারধরে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থলে এলাকাবাসীর ভিড় |নয়া দিগন্ত

কুমিল্লার চান্দিনায় গৃহবধূ সাবিনা আক্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল, সেই মামলা ঘিরে এখন নতুন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মামলার বাদী নিহতের বাবা ময়নাল হোসেনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ উঠেছে, বাদী নিজেই মামলাটিকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ভয়ভীতি ও চাঁদাবাজির এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। আর সেই অভিযোগের মধ্যেই হত্যামামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ঈদের দিন প্রকাশ্যে মারধরে হত্যা করা হয় মরিয়ম আক্তার নামে এক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর মূল অভিযুক্ত নিহত সাবিনার বাবা ময়নাল হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

শনিবার (২১ মার্চ) ঈদের দিন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার গল্লাই ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে এই হত্যার ঘটনা ঘটে।

নিহত প্রতিবন্ধী মরিয়ম আক্তার একই ইউনিয়নের কংগাই গ্রামের মরহুম সিরাজুল ইসলামের মেয়ে। বাবার মৃত্যুর পর তিনি তার মায়ের সাথে মামার বাড়ি হোসেনপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সাবিনা আক্তারের মৃত্যুর পর দায়ের হওয়া হত্যামামলাটি ছিল এই চক্রের মূল হাতিয়ার। মামলায় নাম জড়ানোর ভয় দেখিয়ে নিহত সাবিনার বাবা ময়নাল হোসেন ও তার সহযোগীরা মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনসহ স্থানীয় এলাকার সাধারণ মানুষকে টার্গেট করতেন। প্রথমে সহযোগীরা যোগাযোগ করত, পরে ময়নাল নিজে এসে ‘সমঝোতার’ নামে টাকা আদায় করতেন।

নিহত সাবিনার শ্বশুরবাড়ি এলাকার স্থানীয় মুদি দোকানদার কামাল হোসেন জানান, সাবিনার স্বামী খায়ের তার দোকানে আসা-যাওয়ার সুবাদে এক লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। কিছুদিন পর সাবিনার লাশ উদ্ধার হলে স্বামী খায়েরকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এরপর খায়েরের মা তার কাছ থেকে ওই টাকা নিয়ে যান। পরে সাবিনার বাবা ময়নাল হোসেন তাকে হত্যামামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করেন। আতঙ্কে তিনি এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে ৫৪ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন।

আরেক ভুক্তভোগী গরু ব্যবসায়ী মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, ময়নালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মনির, রিপন ও মাহবুব নামে কয়েকজন একইভাবে তাকে হত্যামামলার আসামি করার হুমকি দিয়ে ৭০ হাজার টাকা নিয়েছে।

তিনি দাবি করেন, এলাকার আরো অনেকজনের কাছ থেকেও একই কৌশলে টাকা আদায় করা হয়েছে।

কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, ময়নালের সহযোগী মনির ফোন দিয়ে তার বাড়িতে এসে অভিযোগ করেন, তার নম্বর থেকে সাবিনার ভাসুরের নম্বরে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি তা অস্বীকার করলে তারা বলে, ডিবির ট্র্যাকিং তালিকায় তার নম্বর আছে এবং সেখান থেকেই তথ্য পেয়েছে। পরে তাকে ভয় দেখিয়ে সাবিনার হত্যামামলায় জড়ানোর হুমকি দেয় এবং রাত ১১টা পর্যন্ত আটকে রেখে এক লাখ টাকা দাবি করে। শেষ পর্যন্ত আট হাজার টাকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান।

এছাড়াও একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে কথা হলে তারা অভিযোগ করে বলেন, গত তিন মাসে অন্তত ১২ জন এই চক্রের শিকার হয়েছেন এবং তাদের কাছ থেকে প্রায় নয় লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। টাকা না দিলে হত্যামামলায় ফাঁসানোর হুমকি ছিল নিয়মিত। ভুক্তভোগীরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ ঈদের দিন (২১ মার্চ) একই কৌশলে টার্গেট করা হয় সাবিনার দেবর হাসানকে। অভিযোগ, ময়নালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মনির, রিপন ও মাহবুব নামে কয়েকজন বাড়িতে গিয়ে হাসানকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে। দরিদ্র শ্রমিক হাসান টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে।

হাসানের মা (সাবিনার শাশুড়ি) কারিমা খাতুন বলেন, ঈদের দিন বিকেলে তিন-চারজন লোক এসে আমার ছোট ছেলে হাসানকে ঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে। আমার ছেলে শ্রমিকের কাজ করে। তাদের দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় হাসানকে মারধর শুরু করে। এ সময় আমি ও আমার প্রতিবন্ধী নাতনি মরিয়ম বাধা দিতে গেলে তারা মরিয়মকেও মারধর করে। এতে মরিয়ম ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়ে এবং পরে তার মৃত্যু হয়।

তিনি আরো জানান, এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে এবং পুলিশ মামলার প্রধান আসামি ময়নালকে গ্রেফতার করেছে।

এ বিষয়ে চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, গৃহবধূ সাবিনা হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবা ময়নাল হোসেন বিভিন্ন ব্যক্তিকে হত্যামামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

তিনি আরো জানান, ঈদের দিন একইভাবে ময়নাল হোসেন নিহত সাবিনার দেবরের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রাথমিকভাবে হত্যার আলামত পাওয়ায় এ ঘটনায় মামলা গ্রহণ করে ময়নাল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে ময়নাতদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে এবং মামলাটি গুরুত্বের সাথে তদন্তাধীন রয়েছে।