যশোরের চৌগাছায় আমনের ভরা মৌসুমে সার পাচ্ছেনা চাষিরা। সারের ঘাটতি নেই তবুও সার পাচ্ছে না তারা। দিনের পর দিন ডিলারের দোকানে ঘুরেও সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। অথচ উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব বলছে, আমন মৌসুম সামনে রেখে উপজেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চার মাসে ডিলারদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৭৭ মেট্রিক টন সার। যা প্রায় এক লাখ ১১ হাজার ৫৪০ বস্তার সমান।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি দামে সার না মিললেও বাড়তি টাকা দিলে অনেক ডিলারের কাছ থেকে সার পাওয়া যাচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে কেউ কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আমন চাষিদের প্রশ্ন তাহলে সরকারের বরাদ্দ করা এইবিপুল পরিমাণ সার যাচ্ছে কোথায় ? কৃষকের প্রয়োজনের সময় বাজারে কেন দেখা দিচ্ছে সঙ্কট?
উপজেলা কৃষি অধিদফতর অফিস সূত্রে জানা যায়, চৌগাছা উপজেলায় মোট ৩৭ জন ডিলার রয়েছেন। এর মধ্যে ১৬ জন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি), ২১ জন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ডিলার। এসব মূল ডিলারের অধীনে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় রয়েছেন ১১০ জন সাব-ডিলার। মূল ডিলারদের মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়া সার এসব সাব-ডিলারের কাছে সরবরাহ করা হয়। তাদের মাধ্যমেই কৃষকদের মধ্যে সকল প্রকার সার বিতরণ করা হয়ে থাকে।
কৃষি অফিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে চলতি মাস পর্যন্ত উপজেলায় মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৭৭ টন। এর মধ্যে টিএসপি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক হাজার ৭০ টন, ডিএপি ৯১৩ টন, ইউরিয়া দুই হাজার ৮৫০ টন এবং এমওপি ৭৫৯ টন। এদিকে চলতি আগস্ট মাসেই উপজেলায় বরাদ্দ রয়েছে ৫৫০ টন টিএসপি, ৪৩০ টন ডিএপি, এক হাজার ৪১০ টন ইউরিয়া এবং ৩৫৯ টন এমওপি। চলতি আমন মৌসুমে ফল ও আমনসহ বিভিন্ন আবাদ রয়েছে প্রায় ১৯ হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগের বরাদ্দের হিসাব অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ সার কৃষকদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হলে সারসঙ্কট হওয়ার কথা নয়। এক লাখ ১২ হাজার বস্তা দেয়া হয়েছে বরাদ্দ আসলেও কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। চাষি তার চাহিদা অনুযায়ী সরকারি মূল্যে সার পাচ্ছেন না।
পৌর শহরের কুঠিপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে ডিলারদের কাছে বারবার গিয়েও সরকারি দামে সার পাইনি। অথচ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিলে সার পাওয়া যায়। আমার আমন ধানের পাশাপাশি দুই বিঘা জমিতে বিভিন্ন তরি-তরকারিরআবাদ ও দুই বিঘা জমিতে আখের চাষ রয়েছে। সারে জন্য প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ডিলারদের নিকটসারের জন্য গেলে তারা বলেন বরাদ্দ আসেনি সার নেই।’
সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের কুলিয়া গ্রামের কৃষক বাবু হোসেনের অভিযোগ সার আছে, কিন্তু কৃষকের জন্য নেই। বেশি টাকা দিতে পারলে ঠিকই সার পাওয়া যায়।
উপজেলার স্বরুপদাহ গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম, আন্দারকোটা গ্রামের আশাদুল ইসলাম, খড়িঞ্চা নওদাপাড়া গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুন, বহিলাপোতা গ্রামের কৃষক আবু ইউছুপ বলেন, ডিলারের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়েও সরকারি মূল্যে সার পায়নি। বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিলাররা। বিসিআইসি ডিলার হোসেন ট্রেডার্সের মালিক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মাঝে কিছুদিন একটু সমস্যা হয়েছিল। এখন সারের কোনো ঘাটতি নেই। তার বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কৃষক সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হয়তো তখন সার ছিল না। তবে আগস্ট মাসে বরাদ্দ এসেছে এখন আর সারের সমস্যা হবে না ‘
এদিকে একটি সূত্রের জানায়, কিছু ডিলার মাসের শেষ দিকে সার উত্তোলন করেন। এরপর তা চড়া দামে কালোবাজারে বিক্রি করেন। কিছু সাব ডিলার রয়েছেন যারা ভূয়া নাম ঠিকানা ব্যবহারকরে সার বিক্রি দেখিয়ে গোপনে মজুদ রেখে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেন। কৃষকদের প্রশ্ন বরাদ্দ যদি যথেষ্টই থাকে, তাহলে নির্ধারিত দামে সার পেতে তাঁদের দিনের পর দিন ডিলারের দোকানে ঘুরতে হচ্ছে কেন?
সরকারি বরাদ্দের সার যদি যথাযথভাবে কৃষকের হাতে পৌঁছে থাকে, তাহলে বাজারে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগই বা উঠছে কেন?
কৃষকদের দাবি, শুধু বরাদ্দ দেয়াই নয়, বরাদ্দের প্রতিটি বস্তা সার কোথায় গেল, কোন ডিলার কতটা উত্তোলন করলেন এবং কতটা কৃষকের কাছে বিক্রি করলেন, এসব তথ্য যাচায় পূর্বক কঠোর নজরদারি করলে সার সঙ্কটের আসল কারন বেরিয়ে আসবে।
চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোশাব্বির হোসাইন কিছুটা সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের কৃষকেরা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করেন। এ কারণে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়। এছাড়া জনবল সঙ্কটের সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইচ্ছা করে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা করেন। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আশা করি সঙ্কট কেটে যাবে।


