ঝালকাঠি সংবাদদাতা
ইনকিলাব মঞ্চ ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির স্মরণে ঝালকাঠিতে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (২১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় জেলা প্রেস ক্লাবের কাজী খলিলুর রহমান মিলনায়তনে এ শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ওসমান হাদির সহপাঠিরা, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
শোকসভায় ওসমান হাদির জীবন, রাজনৈতিক দর্শন, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, ওসমান হাদি ছিলেন বাংলাদেশপন্থী নতুন ধারার রাজনীতির একজন স্পষ্ট কণ্ঠ। বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও টেলিভিশন টকশোতে তিনি বারবার ইনসাফ কায়েমের কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং আধিপত্যবাদের বিরোধিতা স্পষ্টভাবে উঠে আসত।
বক্তারা বলেন, সংস্কৃতির নামে যে একচেটিয়া আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়া হয়— ওসমান হাদি সেটিকে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাতেন।
শোকসভায় আরো বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ১৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ওসমান হাদি ছাত্র–জনতা অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মকে সামনে এগিয়ে নেন। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে তিনি গান, কবিতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন।
বক্তারা তার ব্যক্তিগত জীবনও স্মরণ করেন। তারা বলেন, ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার খাসমহলের মুন্সি বাড়িতে জন্ম নেয়া ওসমান হাদি একটি ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা মরহুম মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। শিল্প–সাহিত্যচর্চার অংশ হিসেবে ‘সীমান্ত শরিফ’ ছদ্মনামে তার কাব্যগ্রন্থ লাভায় লালশাক পুবের আকাশ প্রকাশিত হয়।
ঝালকাঠি জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে ১৬ জুলাই থেকে যখন ব্যাপকভাবে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তখন কয়েক জনের নামের সাথে ওসমান হাদির নাম ততটা আসেনি। তিনি আলোচনায় আসেন তিন ও চার আগস্ট তারিখে শাহাবাগে একটি স্লোগানে। লাফিয়ে লাফিয়ে উদ্দীপ্ত জাওয়ানের মতো বলতে শুনেছিলাম দিল্লি না ঢাকা। সেই স্লোগান থেকেই আমি তাকে প্রথম চিনেছি। এরপর ৫ আগস্টের পটভূমি পরিবর্তনের পরে বিভিন্ন টকশো ও আলোচনায় তার কথাবার্তা অসংখ্যবার শুনেছি। এখনো পুরোনো রেকর্ড গুলো শুনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘তার কথা বলার ধরণে ভয় ছিল না। যা বিশ্বাস করতেন, সেটাই বলতেন।’
জেলা প্রশাসক মো: মোমিন উদ্দিন বলেন, ‘ওসমান হাদিকে আমরা শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী বা সংগঠক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তিনি ছিলেন চিন্তাশীল একজন মানুষ, যিনি সময়ের অনেক আগেই কিছু বিষয় বুঝতে পেরেছিলেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রাজপথে যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি যুক্তি ও চিন্তার জায়গাতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদির রাজনীতি ছিল মেধাভিত্তিক। তিনি আবেগ দিয়ে মানুষকে টানতেন না, তিনি কথা বলতেন যুক্তি দিয়ে। বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও টকশোতে আমরা দেখেছি— তিনি কঠিন বিষয়ও সাধারণ ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন। আধিপত্যবাদ, সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা ইতিহাসের উদাহরণ টেনে তিনি যে বিশ্লেষণ দিতেন, তা অনেক তরুণের চিন্তাকে নাড়া দিয়েছে।’
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ‘ইনকিলাব মঞ্চ ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়ে গেছেন, রাজনীতি শুধু স্লোগান আর মিছিল নয়— সংস্কৃতি, চিন্তা আর মননও রাজনীতির বড় শক্তি। এ জায়গায় তার অবদান ভবিষ্যতেও আলোচনা হবে।’
তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদির জীবন ও চিন্তা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। তার স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো স্থায়ী উদ্যোগ— যেমন একটি মিউজিয়াম, স্মরণকেন্দ্র বা গবেষণাধর্মী আয়োজন— নেয়া যায় কি না, সে বিষয়ে আপনারা যদি প্রস্তাব দেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করব। এ বিষয়ে ঝালকাঠিবাসীর পক্ষ থেকে একটি লিখিত প্রস্তাব পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’
শোকসভায় আরো বক্তব্য রাখেন ঝালকাঠি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন, সিভিল সার্জন ডা: মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির, ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান, পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাসিমুল হাসান, বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবিরের জেলা শাখার সভাপতি এনামুল হাসান, জেলা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রেজাউল হক আজিম, শহীদ ওসমান হাদির সহপাঠী সাংবাদিক ইসমাঈল মুসাফিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা। প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-আমিন তালুকদার সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আককাস সিকদার।
শোকসভা শেষে শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।



