বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, ‘জামায়াত বিজয়ী হলে তিন শর্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠন করা হবে।’
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টায় রংপুর মহানগরীর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ ঘোষণা দেন তিনি।
ডা: শফিক বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী আল্লাহর মেহেরবানিতে আপনাদের ভোটের মাধ্যমে যদি দেশবাসীকে পরিচালনার জন্য সরকার গঠনের সুযোগ দেন, এবার যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন, তাদেরকে আমরা আহ্বান করবো আসুন পাঁচটা বছর দেশটা এক হয়ে চালাই। তবে তিনটা শর্ত মেনে আসতে হবে।’
শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথম শর্ত হচ্ছে নিজেরা কোনো দুর্নীতি করবো না। এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে বোগলের নিচে আশ্রয় দিবো না।’
ডা: শফিক বলেন, ‘দ্বিতীয় শর্ত সমাজের সকল মানেুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করার সাহস কেউ দেখাবো না। এতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে পারবেন না। বিচারবিভাগকে আপন গতিতে চলতে দিতে হবে। এবং বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। যাতে অর্থের বিনিময়ে নয়, ন্যায্যতার ভিত্তিতে একজন মানুষ যেন ন্যায়বিচার পায়। কে কোন দল করলো, সমাজের কে কোন চেয়ারে বসে আছে সেটা দেখার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষকে যেমন আইনের আওতায় আনা হবে, একই অপরাধ যদি দেশের প্রেসিডেন্টও করেন তিনিও রেহাই পাবেন না। কারো জন্য বিচার, কারো জন্য দায়মুক্তি- এর নাম বিচার নয়। এটা বৈষম্য। এটা বিচারের ওপর জুলুম। আমরা বিচারের ওপর জুলুম মানবো না।’
তিন নম্বর শর্ত হিসেবে তিনি বলেন, ‘তিন নম্বর শর্ত, বস্তাপচা রাজনীতি, যা অতীতে হয়েছে ওই বস্তাপচা রাজনীতি আর আমরা চাই না। যে রাজনীতি তার নেতানেত্রীদের চোর বানায়, লুটেরা বানায়, সন্ত্রাসী বানায়, ফ্যাসিস্ট বানায়- ওই রাজনীতি আর আমরা দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ যাতে আর ফিরে না আসে। দুর্নীতিবাজরা আর যাতে সমাজে চলাফেরা করতে না পারে। নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য লড়াই করতে হবে।’
‘এই তিন শর্ত যারা মানবে। তাদের নিয়েই আমরা সরকার গঠন করতে চাই,’ বলেন জামায়াত আমির।
এর আগে, ঠাকুরগাঁও থেকে সমাবেশ করে রংপুরে জনসভার মঞ্চের আসেন রাত পৌণে ৮টায়। এরপর তিনি ২৮ মিনিট বক্তৃতা করেন।
‘বেকার ভাতা দিয়ে বেকার তৈরির কারখানা নয়, প্রতিটি নারী-পুরুষের হাতে মর্যাদাপূর্ণ কাজ তুলে দিতে চাই’
জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘বেকার ভাতা দিয়ে বেকার তৈরি কারখানা নয়, দেশের প্রতিটি নারী-পুরুষের হাতে মর্যাদাপূর্ণ কাজ তুলে দিতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে আমরা মিথ্যা আশ্বাস দিতে চাই না। দিবো না। যা আমরা পারবো না। তা আমরা বলবো না। যা আমাদের কর্তব্য বলে আমরা মনে করি শুধু তাই বলবো।’
বিএনপির বেকার ভাতা দেয়ার প্রসঙ্গ টেনে ডা: শফিকুর বলেন, ‘আমরা কাউকে ভাই বেকার ভাতা দিবো না। বেকার ভাতার মানে হচ্ছে বেকারের কারখানা তৈরি করা। আমরা বেকারের কারখানা তৈরি করতে চাই না। আমরা দেশের প্রত্যেকটি সক্ষম নারী-পুরুষের হাতকে আমরা শক্ত হাতে পরিণত করতে চাই। বেকার ভাতা নয়, তাদের হাতে আমরা মর্যাদাপূর্ণ কাজ তুলে দিতে চাই। সে বুক ফুলিয়ে বলবে, আমি কিন্তু কারো কোনো দয়ার দানে চলতে চাই না। আল্লাহর দেয়া মেধা ও যোগ্যতা খাটিয়ে আমি সম্মানের সাথে বাঁচতে চাই। এরমাধ্যমে প্রত্যেকটি নারী-পুরুষ দক্ষ হয়ে ওঠবে। আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। সেদিনই বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটা বাংলাদেশ বিশ্ব দেখতে পাবে, ইনশাআল্লাহ।’
‘দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করবে’
জামায়াত আমির বলেন, ‘অনেকে বলে, মা বোনদের কি কোনো স্পেস থাকবে? যখন আপনারা কাজ করবেন। দেশ চালাবেন। মা-বোন ছাড়া যেমন ঘর চলে না, তেমনিও সমাজও চলে না। নারীদের কিছু কর্ম আছে যারা আপনি-আমি কেউই করতে পারবো না। আমার মায়ের, আমার বোনের, আমার মেয়ের, আমার স্ত্রীর কিছু কিছু বিষয় আছে, যেটা শুধু নারীদের জন্যই রেজিগনিটেড। এটা পুরুষের দ্বারা হবে না। রাসূল সা:-এর জামানায় প্রত্যেকটি যুদ্ধে নারীরা অংশ নিয়েছেন। যুদ্ধের চেয়ে কঠিন কোনো কাজ নেই।’
তিনি বলেন, ‘কোনো কাজ যদি সম্মানের সাথে নারীরা দেশপ্রেম বুকে নিয়ে করতে পারেন, দেশের প্রত্যেকটা সেক্টরে আমরা মা-বোনদের নিয়ে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ। এখানে আমরা দেখবো না কোন নারী কোন ধর্মের। এখানে আমরা দেখবো কোন মা-বোনটি কোন যোগ্যতার। তার যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানের সাথে তার হাতে কাজ তুলে দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ।’
ডা: শফিক বলেন, ‘আমরা এখানে আমাদের প্রিয় দেশ ও জাতিকে আর টুকরা টুকরা করতে চাই না। আর বিভক্ত করতে চাই না। আমরা সাম্যের ও ঐক্যের আওয়াজ নিয়ে আপনাদের দোয়ারে এসেছি। আপনারা আমাদের ঐক্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের হাতকে শক্তিশালী করুন।’
রংপুর মহানগর জামায়াত আমির এ টি এম আজম খানের সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-৩ আসনের এমপি প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল, এনসিপির সদস্য সচিব রংপুর-৪ আসনের এমপি প্রার্থী আখতার হোসেন, রংপুর-৫ আসনের এমপি প্রার্থী গোলাম রব্বানী, রংপুর-৬ আসনের এমপি প্রার্থী মাওলানা নুরুল ইসলাম, রংপুর-১ আসনের এমপি প্রার্থী রায়হান সিরাজী, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, মহানগর শিবির সভাপতি নুরুল হুদা, জেলা শিবির সভাপতি ফিরোজ মাহমুদ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সভাপতি সুমন সরকার, এনসিপির জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, ছাত্রশক্তির মহানগর আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি প্রমুখ।
দুপুর থেকেই সমাবেশস্থলে আসতে থাকেন ১০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ ছাপিয়ে জনতার ঢল চলে যায় নগরীর প্রধান সড়ক, জুলাই স্মৃতি স্তম্ভসহ আশেপাশের সকল সড়ক ও ফাঁকা জায়গায়।
শেষে জামায়াত আমির রংপুরের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী এবং একটি আসনে আখতার হোসেনের হাতে শাপলা কলি প্রতীক তুলে দিয়ে বলেন, ‘যাহাই দাঁড়িপাল্লা তাহাই শাপলা কলি, যেখানে শাপলা কলি সেখানেই দাঁড়িপাল্লা।’



