জুলাই বিপ্লবে শিবচরের প্রথম শহীদ শিহাব হত্যার বিচার চায় পরিবার

খাবার খেয়ে কাজে ফেরা পথে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শিহাব। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা

Location :

Shibchar
শহীদ শিহারের কবরস্থান
শহীদ শিহারের কবরস্থান |নয়া দিগন্ত

২৪-এর ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন হৃদয় হোসেন শিহাব (১৭)। জুলাই বিপ্লবে মাদারীপুর জেলার শিবচরের প্রথম শহীদ হন তিনি। তিনি মাদারীপুরের শিবচরের সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের আজগর হাওলাদার কান্দি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা মো: শাহ আলম হাওলাদার ও নাছিমা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে।

জানা গেছে, শিহাবের বাবা শাহ আলম প্রায় নয় বছর আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন। এরপর থেকে তিনি ভারী কাজ-কর্ম করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন শিহাব।

পরিবার আরো জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে ফুপাতো বোনের বাসায় দুপুরের খাবার খেতে যান শিহাব। খাবার শেষে নিজ কর্মস্থলে ফেরার পথে রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় চলমান ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় চতুর্দিক আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় একটি গুলি তার শরীরে এসে বিদ্ধ হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে তাকে একটি স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরে বনশ্রীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে ইমারজেন্সি মেডিক্যাল কর্মকর্তা শিহাবকে মৃত ঘোষণা করেন।

সরেজমিন শিহাবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শিহাবের বাবা শাহ আলম ও মা নাছিমা ছোট্ট একটি টিনের ডেরায় বসবাস করেন। পরিবারের নিজস্ব বসতভিটা ছাড়া বাড়তি কোনো জমি-জমা নেই। বসবাসের ডেরাটিও বসবাসের অনুপযোগী। কোনোমতে তারা দিনাতিপাত করছেন। শিহাবের মা সেলাইয়ের কাজ করে সামান্য আয় করেন। এছাড়া জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ টাকা ব্যাংকে এফডিআর করে রেখেছেন। সেখান থেকে যে মুনাফা আসে তা দিয়ে তাদের সংসার চলছে।

ছেলের কথা বলতেই কান্না ভেঙে পড়েন শিহাবের মা নাছিমা। অশ্রু সজল কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের কি অপরাধ ছিল! ১৮ জুলাই রাতে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল শিহাবের সাথে। বলেছিল, মা শুক্রবার সকালে বাড়ি আসবো। শিহাবের পছন্দের খাবারও রান্না করেছিলাম। পরে সকালে ফোন করে জানায়, রোববার বাবার সাথে বাড়িতে ফিরব। আমি শুধু বলেছিলাম, বাবা ঢাকার অবস্থা ভালো নয়। ছাত্র আন্দোলন চলছে। সাবধানে থাকিস বাবা! তখন সে বলেছিল মা চিন্তা করো না! এটিই ছিল শিহাবের জীবনের শেষ কথা।’

শিহাবের একমাত্র বড় বোন সাথী আক্তার বলেন, ‘অনেক নেতা-নেত্রী ও গন্যমান্য ব্যক্তিরা আমাদের পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে এসেছেন, আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তেমন সাহায্যে-সহযোগিতা করছেন না। আমাদের পরিবারটি অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।‘

কান্না বিজড়িত কণ্ঠে শিহাবের বাবা শাহ আলম বলেন, ‘আমার ছেলের কোনো অপরাধ ছিল না। ওরে কেনো গুলি করে মারল! আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম! আমার নিরাপরাধ ছেলেকে যারা গুলি করে মেরেছে, আল্লাহ তুমি তাদেরকে শাস্তি দিও!’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি বর্তমান সরকারের কাছে আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। সবাই আমার পরিবার ও ছেলের জন্য দোয়া করবেন। বর্তমান সরকার যদি আমাদের কোনো স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে ঠিক মতো আমার সংসার চালাতে পারতাম।’

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, ‘আমরা শহীদ শিহাবের পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। সরকারের পক্ষ থেকে যে সহযোগিতা এসেছে, তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। পরিবারের অনুরোধে হৃদয়ের কবর সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে শিহাবের পরিবারটিকে সহযোগিতা করা হবে।’