তিস্তার পানি কমলেও কমেনি নিম্নাঞ্চলের দুর্ভোগ, পানিবন্দী হাজারোও মানুষ

উজানের পানির প্রবাহ কমে আসায় তিস্তার পানিও ধীরে ধীরে কমছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

আসাদুল ইসলাম সবুজ, লালমনিরহাট

Location :

Lalmonirhat
তিস্তাপাড়ের নিম্নাঞ্চলে পানিবন্দী হাজারো মানুষ
তিস্তাপাড়ের নিম্নাঞ্চলে পানিবন্দী হাজারো মানুষ |নয়া দিগন্ত

ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি গতকাল পর্যন্ত বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও আজ ধীরে ধীরে তা কমতে শুরু করেছে। তবে নিম্নাঞ্চলের মানুষদের দুর্ভোগ এখনো কমেনি।

নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এলেও চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বহু ঘরবাড়ি এখনো জলমগ্ন। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার পানিবন্দী মানুষ। রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানির নিচে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) সন্ধ্যা ৬টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫১ দশমিক ৯৮ মিটার। যা বিপৎসীমার (স্বাভাবিক ৫২.১৫ মিটার) ১৭ সেন্টিমিটার নিচে।

এর আগে, রোববার (২৮ জুন) সন্ধ্যা ৬টায় এই পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার সাত সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল এবং রাতভর এই পরিস্থিতি বজায় থাকে। সোমবার সকাল ৬টায় পানি বিপৎসীমার সমান্তরালে আসে এবং সকাল ৯টার পর থেকে তা আরো কমতে শুরু করে।

জেলার পাঁচটি উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় তলিয়ে গেছে শত শত টিউবওয়েল ও টয়লেট। ফলে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের তীব্র সঙ্কট। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও নারীরা স্যানিটেশন সমস্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

বন্যার পানি প্রবেশ করায় তিস্তাপাড়ের বেশ কিছু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। যাতায়াতের জন্য নৌকা আর কলাগাছের ভেলাই এখন চরাঞ্চলবাসীর একমাত্র ভরসা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের অস্থায়ী ক্যাম্প দেখা গেলেও এবার তাদের কোনো তৎপরতা নেই। যার ফলে পানিবাহিত রোগের শঙ্কা বাড়ছে।

আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সারা আইত (রাত) নিন্দ (ঘুম) হয় নাই ভাই। বিছানার নিচত (নিচে) পানি। ছাওয়া পোয়া (ছেলে-মেয়ে) নিয়ে বিছানায় বসে আইত কাটাইছি। দুপুর থেকে একটু কমতেছে পানি। হামার (আমার) কষ্ট কায়ো (কেউ) দেখে না বাহে। সরকারি লোকরা আসি সড়ক থেকি দেখি চলি যায়।

একই এলাকার হয়রত আলী (৫৫) জানান, গবাদিপশু নিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। উজান থেকে পানি আসায় রাতভর গবাদিপশু নিয়ে উঁচু সড়কে কাটাতে হয়েছে। চারদিকে পানি থাকায় পশুখাদ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, উজানের পানির প্রবাহ কমে আসায় তিস্তার পানিও ধীরে ধীরে কমছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পানি কমতে শুরু করলেও তিস্তাপাড়ের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাস্তব চিত্র এখনো ভয়াবহ।

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, আমি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হলেই দ্রুত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো হবে।

সার্বিক ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান জানান, দুর্যোগ মোকাবেলায় ইতোমধ্যেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুকূলে ২২০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যেই ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।