জঙ্গল সলিমপুর রক্ষায় তিন পরিবেশ সংগঠনের তাগাদা নোটিশ

উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান

‘চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়গুলো নির্বিচারে কেটে ফেলা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও দখলদারিত্ব বন্ধে উচ্চ আদালতের ২০১২ সালের সুস্পষ্ট রায় থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। জঙ্গল সলিমপুরসহ আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পাহাড় কর্তন ও দখল অব্যাহত থাকায় পরিবেশ বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করছে।’

নিজস্ব প্রতিবেদক
জঙ্গল সলিমপুর রক্ষায় তিন পরিবেশ সংগঠনের তাগাদা নোটিশ প্রদান
জঙ্গল সলিমপুর রক্ষায় তিন পরিবেশ সংগঠনের তাগাদা নোটিশ প্রদান |সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ পাহাড় কাটা, দখল ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ এবং পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উচ্চ আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার দাবিতে তাগাদা নোটিশ দিয়েছে তিনটি পরিবেশবাদী সংগঠন। সংগঠনগুলো হলো—বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম এবং সৃষ্টি।

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান বরাবর এ তাগাদা নোটিশ পাঠানো হয়।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়গুলো নির্বিচারে কেটে ফেলা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও দখলদারিত্ব বন্ধে উচ্চ আদালতের ২০১২ সালের সুস্পষ্ট রায় থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। জঙ্গল সলিমপুরসহ আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পাহাড় কর্তন ও দখল অব্যাহত থাকায় পরিবেশ বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করছে।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে বেলা কর্তৃক দায়ের করা জনস্বার্থ মামলা (রিট পিটিশন নম্বর ৭৬১৬/২০১১) এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সকল পাহাড় কাটা সম্পূর্ণভাবে বন্ধের নির্দেশ প্রদান করেন। একইসাথে পাহাড় ধ্বংসের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে পাহাড় কাটার ঘটনা অব্যাহত থাকায় ২০২৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগ প্রশাসনকে আরো বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। তবে আদালতের এসব নির্দেশনা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ পরিবেশ সংগঠনগুলোর।

তাগাদা নোটিশে বলা হয়, জেলা প্রশাসন ২০২২ ও ২০২৩ সালে কয়েক দফা অভিযান পরিচালনা করলেও পাহাড় রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এর সুযোগ নিয়ে দখলদার চক্র পাহাড় কেটে প্লটিং, স্থাপনা নির্মাণ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিস্তার করছে। ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সংগঠনগুলো আরো অভিযোগ করে, সম্প্রতি জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। সর্বশেষ এক অভিযানে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরিবেশবাদীদের মতে, পাহাড় দখল, অবৈধ স্থাপনা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একই চক্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নেটওয়ার্ক মেম্বার আলীউর রহমান বলেন, ‘এই তাগাদা নোটিশের পরও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে আদালত অবমাননার মামলাসহ অন্যান্য আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নগরীর অদূরে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর আজ সন্ত্রাসী ও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

পরিবেশ সংগঠনগুলো তাদের দাবিতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অবিলম্বে পাহাড় কাটা ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পাহাড়ি জমি পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দেশীয় বৃক্ষরোপণ এবং স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি পাহাড় রক্ষায় আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, জঙ্গল সলিমপুর কেবল একটি পাহাড়ি এলাকা নয়; এটি চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক জলাধার, বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে।