রংপুরে ২৫ বছর ধরে ২৫ গ্রামের মানুষ সরাসরি সড়ক থেকে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন

রংপুরের মিঠাপুকুরে ঘাঘট নদীতে রাস্তা বিলীন হওয়ায় ২৫ বছর ধরে ২৫ গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সরাসরি সড়ক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগে পড়লেও এখনো পুনর্নির্মাণ হয়নি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
রংপুরে ২৫ বছর ধরে ২৫ গ্রামের মানুষ সরাসরি সড়ক থেকে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন
রংপুরে ২৫ বছর ধরে ২৫ গ্রামের মানুষ সরাসরি সড়ক থেকে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন |নয়া দিগন্ত

সরকার মাজহারুল মান্নান, ব্যুরো

রংপুরে বন্যায় ভেঙে যাওয়া রাস্তা দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় ২৫ গ্রামের মানুষ সরাসরি সড়ক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি ও বারবার আন্দোলনের পরেও রাস্তাটি মেরামত না করায় অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ।

রংপুরের মিঠাপুকুরের ভাংনির কাগজিপাড়া-ফকিরটারি এলাকায় ২৫০ মিটার রাস্তা ঘাঘট নদীতে বিলীন হওয়ায় ২৫ বছর ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুই পাড় মিঠাপুকুর ও পীরগাছা উপজেলার চারটি ইউনিয়েনের ২৫টি গ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। এতে ওই এলাকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন অসুবিধায় ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক। হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসহ যাতায়াতের অসুবিধায় তারা। ২০ কিলোমিটারেও বেশি দূরত্ব ঘুরে যেতে হয় উপজেলা সদরে।

বিভিন্ন দফতরে দেয়া আবেদন এবং সরেজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, প্রায় ২৬ বছর আগে মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংগনি ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ী হতে পীরগাছা উপজেলার দেউতিগামী ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের স্থাণীয় সরকার বিভাগের রাস্তাটির কাগজীপাড়ার জাইদুল ইসলামের দোকানের পাশ থেকে ফকিরটারী মসজিদ পর্যন্ত ২৫০ মিটার রাস্তা ঘাঘট নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এরপর থেকেই বিচ্ছিন্ন মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংগনি, পায়রাবন্দ, বালারহাট ও পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়নের ২৫টি গ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। এর মধ্যে মিঠাপুকুরের ভাংগনি ইউনিয়নের কাগজিপাড়া, ফকিরটারি, ঠাকুরবাড়ি, দক্ষিণটারি, চানপুর, মাঠেরহাট, পীরগাছার পারুল ইউনিয়নের দেউতি, সৈয়দপুরসহ গ্রাম অন্যতম। এতে যাতায়াতে ভয়াবহ ভোগান্তি ওইসব গ্রামের মানুষে।

মিঠাপুকুরের ভাংগনি ও বালারহাট ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষকে রংপুর মহানগরী ও পীরগাছা উপজেলায় ব্যবসা বাণিজ্য এবং রোগী নিয়ে যেতে ২০ কিলোমিটার বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। অপরদিকে মিঠাপুকুর উপজেলা সদরে যেতে হচ্ছে পারুল ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষকে ঘুরতে হয় ৩০ কিলোমিটারেরও বেশি। সব থেকে ভোগান্তি শিক্ষার্থী, রোগী এবং কৃষিপণ্য যাতায়াতে।

বিলীন হওয়া রাস্তাটির উত্তরপ্রান্তে আছে কাগজিপাড়া আশরাফিয়া দাখিল মাদরাসা, ঠাকুরবাড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হুলাশুগঞ্জ দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়, বেতগাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, ভাংনী আহমাদিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদরাসাসহ বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও সরকারি স্থাপনা। দক্ষিণ প্রান্তে আছে সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সৈয়দপুর ফাজিল (ডিগ্রি মাদরাসা) দেউতি উচ্চ বিদ্যালয় ও দেউতি মহাবিদ্যালয়, মেকুড়া কামিল মাদরাসা,আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ৫০টিরও বেশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারি বিভিন্ন স্থাপনাও আছে।

সরেজমিনে এলাকাবাসী কাগজিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কফিল উদ্দিন বলেন, ‘ কাগজীপাড়ার জায়দুল ইসলামের দোকান থেকে ফকিরটারী জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তাটি ঘাঘট নদীতে বিলীন হওয়ায় ২৫ বছর ধরে আমরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আছি। খুবই সমস্যা। আমরা ফকিরটারি, দেউতি, পীরগাছা, লাইনে যাইতেই পারছি না।’

মাঠেরহাট এলাকারবাসিন্দা আব্দর রউফ বলেন, ‘রাস্তাটি নদীতে ভেঙে যাওয়ার কারণে আমাদের চলাফেরা করা, আবাদ সুবাদ আনা নেয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে। একজন মানুষ অসুস্থ্য হলে তাকে হাসপাতালে নেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালে নিতে হলে ৩০ কিলোমিটার বেশি ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে হাসপাতালে যাওয়ার আগে রোগীর অবস্থা আরো অবনতি হয়।’

দক্ষিনটারী গ্রামের আশিকুর রহমান বলেন, ‘এই রাস্তাটি পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় ২০ কিলোমিটার ঘুরে রংপুরে যাতায়াত করতে হয়। ঘাঘটপারে এবং জেগে উঠা চরে যে আবাদ হয় সেই কৃষিপণ্য গুলো পরিবহন করা যাচ্ছে না। ফলে আমরা ন্যায্যমূল্য পাই না। পানির দরে এসব আমাদের বিক্রি করতে হয়।’

কাগজিপাড়া গ্রামের শিক্ষার্থী সোহেল ইসলাম বলেন, ‘আমি পীরগাছার দেউতি হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। এই রাস্তাটি না থাকায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে অন্য পথ দিয়ে যেতে হয় স্কুলে। এতে ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট বেশি লাগে। এজন্য স্কুল টাইমের ২ ঘণ্টা আগে আমাকে পড়ালেখা থেকে উঠে প্রস্তুতি নিতে হয়। রাস্তাটি হলে ছয় কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে পারতাম। তখন সময় বাঁচতো। এই গ্রাম থেকে অনেক শিক্ষার্থী ওই স্কুলে পড়ি। সকলের একই অবস্থা।’

ফকিরটারি গ্রামের মোখতার আলম বলেন, ‘রাস্তাটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর থেকেই আমাদের শিক্ষার্থীদের স্কুল কলেজে যাওয়া খুব কষ্ট হচ্ছে। বন্যার সময় নৌকাতে বা ভুরায় যাতায়াত করা লাগে। বাচ্চারা অনেক সময় পানিতে পরে যায়। অনেক সময় বাচ্চাদের স্কুল পাঠাই না ভয়ে।’

এই গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক মনছুর আলী বলেন, ‘এই রাস্তাটুকু না থাকায় আমরা ঠাকুরবাড়ি থেকে সোবহানের ঘাট পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারছি না প্রায় ২৫ থেকে ২৬ বছর ধরে। জমির আইল দিয়ে কোনোমতে আমরা যাতায়াত করি। আবাদ করি। রিকশা, গাড়ি, অটো কোনো কিছুই চলে না। এই গ্রামের অনেকই ব্যবসা বাদ দিয়েছেন রাস্তা না থাকার কারণে।’

ফকিরটারী গ্রামের অপর কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘২৭ থেকে ২৮ বছর আগে এই রাস্তাটি ঘাঘটের গর্ভে বিলীন হয়েছে। তখন থেকেই আমাদের দুর্ভোগ। এই রাস্তাটি সরাসরি রংপুর থেকে দেউতি, ঠাকুরবাড়ি, হুলাশু, মাদারগঞ্জ হয়ে গাইবান্ধা গেছে। পাশে সিনিয়র মাদরাসা আছে। মসজিদ আছে। এটা ভরা গ্রাম। বাজার আছে তিনটা। কিন্তু আমরা যাতায়াত করতে পারছি না। হাট বাজার করা খুবই কষ্টকর।’

অপর কৃষক কফিল মিয়া বলেন, ‘রাস্তাটি যখন ভেঙে যায়, তখন অনেক চেষ্টা করেছি পুরো গ্রামের মানুষ। কিন্তু ঠেকাতে পারি নেই। আমাদের জমার হাট হলো ঠাকুরবাড়ি। কিন্তু রাস্তা না থাকার কারণে কোনো কৃষিপণ্যই আমরা সেখানে নিয়ে যেতে পারি না। যেতে হলে ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়।’

ফকিরটারি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি যদি মিঠাপুকুর থানায় বা উপজেলায় যাইতে চাই। তাহলে আমাকে এই ৪০০ মিটার রাস্তার কারণেই দেউতি, মাহিগঞ্জ, মডার্ন হয়ে ২০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। রাস্তাটি থাকলে পথ বেশি ঘুরতে হতো না। খরচ ও সময় বাঁচতো।’

মজিবর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘বন্যার পানিতে রাস্তাটি ভেঙে গেছে। আমরা যে ঠাকুরবাড়ি, পায়রাবন্দ, হুলাশু, বালারহাট, মাঠের হাটে যাবো। তার কোনো পথ নেই। আমরা জমার হাট করতে পারি না। এখানে প্রচুর আলু, কলা, ধান সবজির যে আবাদ হয়। সেগুলো রাস্তা না থাকায় কম দামে বিক্রি করতে হয় মাঠেই। পরিবহন খরচ খুবই ব্যয়বহুল হয় ও সময় লাগে অনেক। ফলে চাষীরাও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আমরা সেগুলো নিয়ে পরিবহন করতে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়। সেজন্য আমরা ওই এলাকায় ব্যবসা করি না।’

লুৎফর রহমান নামের এক কৃষক বলেন, ‘আমাদের এখানে ধান আলু ভ্ট্টুা বিশেষ করে কলার আবাদ হয় প্রচুর। কিন্তুমূল্য পাই না। রাস্তার কারণে ৩০ হাজার টাকার কলা বিক্রি করতে হয় জমিতেই ২০ হাজার টাকায়। কারণ গাড়ি ঘোড়া তো আসে না এখানে।’

আব্দুর হালিম মিয়া নামের অপর বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদেরকে সুখানের ঘাট দিয়ে আগে পীরগাছা যাওয়া লাগে। তারপর মিঠাপুকুর যাওয়া লাগে। যাওয়া আসায় খুব কষ্ট। গাড়ি চলে না। ১০ হাজার কৃষিপণ্য ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করা লাগে। বর্ষার সময় আরো কষ্ট। ভূরায় করে পণ্য পারাপার করি। পার করতে না পারলে পচে যায়।’

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান নামের বয়োবৃদ্ধ গ্রামবাসি বলেন, ‘মানুষের চলাফেরা খুবই কষ্ট। আমরা দীর্ঘদিন থেকে স্থাণীয় চেয়ারম্যান, এমপিদের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। আমরা খুবই কষ্টে আছি।’

এ বিষয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন ওয়াহেদী বলেন, ‘আমি চারবছর আগে চেয়ারম্যান হওয়ার পরের দিন থেকেই রাস্তাটির জন্য এলজিইইডি, ডিসি, ইউএনও, পিআইওসহ বিভিন্ন দফতরে আবেদন নিবেদন করেছি। কিন্ত কোনো সাড়া পাইনি। রাস্তাটি না থাকার কারণে দুই উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ২৫টির বেশি গ্রামের মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। সর্বশেষ আমি স্থাণীয় এমপি মহোদয়ের একটি ডিও লেটার নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দিয়েছি। রাস্তাটি হওয়া খুবই জরুরি।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ওই এলাকায় আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। ওখানে ঘাঘট নদীতে রাস্তাটি ভেঙে যায়। সেটি একটি রেকর্ডীয় রাস্তা। এ বিষয়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে আমরা চিঠি পাঠিয়েছি।’

জানতে চাইলে রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনের এমপি গোলাম রব্বানীও রাস্তাটি না হওয়ার কারণে বহু গ্রামের মানুষ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার আগে আমার প্রতিশ্রুতি ছিল। আমি রাস্তাটি করার চেষ্টা করব। এমপি হয়েই আমি সরেজমিনে এলাকাটি পরিদর্শন করেছি। রাস্তাটি হওয়ার জন্য একটি ডিও লেটারও দিয়েছি। আশা করি দীর্ঘ আড়াইদশকের এই সমস্যাটির সমাধান হবে ইনশাআল্লাহ।’