মাদক পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট এখন রেলপথ

সড়কপথে একাধিক চেকপোস্ট ও কঠোর নজরদারির কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা এখন ট্রেনকে তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত পরিবহন মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। মাঝেমধ্যে মাদকসহ কেউ কেউ ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালানই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
মাদকসহ গ্রেফতার নারী
মাদকসহ গ্রেফতার নারী |নয়া দিগন্ত

সড়কপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি বাড়ায় এখন মাদক পাচারের নতুন নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে রেলপথ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহগামী ট্রেনগুলোকে ব্যবহার করে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের মতে, সড়কপথে একাধিক চেকপোস্ট ও কঠোর নজরদারির কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা এখন ট্রেনকে তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত পরিবহন মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। মাঝেমধ্যে মাদকসহ কেউ কেউ ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালানই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ রেলপথের বিভিন্ন রেলওয়ে থানায় প্রতি মাসে শতাধিক মামলা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলাই মাদক উদ্ধারের সাথে সম্পর্কিত। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ট্রেনে মাদক পাচারের পেছনে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে।

সূত্র বলছে, প্রশাসনের নজর এড়াতে চট্টগ্রাম স্টেশন থেকেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ট্রেনে তোলা হয় মাদকদ্রব্য। অভিযোগ রয়েছে, রেলের কতিপয় অসাধু কর্মচারীর সহায়তায় ট্রেনের বিভিন্ন গোপন স্থানে বিশেষ কৌশলে মাদক লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে।

মাদক লুকানোর এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে—ট্রেনের ছাদের হোসপাইপের ভেতর, টয়লেটের দেয়ালের ফাঁক, ইঞ্জিন রুমের ভেতর, গার্ডরুম ও কোচের বিভিন্ন গোপন জায়গা

পুলিশের মতে, অনেক ক্ষেত্রে ট্রেনে বিনা টিকিটে যাত্রী ওঠানামা বেশি হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত তল্লাশি ব্যবস্থা না থাকায় কে কী মালামাল নিয়ে উঠছে তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে মাদক কারবারিরা।

আরো একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রেনে আনা মাদকের বড় অংশই রেললাইনের পাশের বস্তিগুলোতে নামিয়ে দেয়া হয়। অনেক সময় এসব এলাকায় ট্রেনের গতি কমিয়ে দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে সহজেই মাদক নামিয়ে নেয় পাচারকারীরা।

এদিকে সম্প্রতি এসব চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশাসন আবারো নড়েচড়ে বসেছে।

গৌরীপুরে ৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ নারী আটক :
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাত সোয়া ৮টার দিকে গৌরীপুর পৌর শহরের রেলস্টেশন রোড এলাকা থেকে ছয় হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ এক নারী মাদক কারবারিকে আটক করেছে পুলিশ।

আটক নাছিমা আক্তার কণা (৩৬) গৌরীপুর পৌরসভার নতুন বাজার বাড়িওয়ালাপাড়া এলাকার মরহুম আজিজ সর্দারের মেয়ে এবং ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার আকুয়া বোর্ডঘর এলাকার জুলহাস মিয়ার স্ত্রী।

পুলিশ জানায়, তার সঙ্গে থাকা একটি হলুদ রঙের শপিং ব্যাগ থেকে ৩০টি সবুজ জিপার প্যাকেটে ভরা মোট ৬ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৮ লাখ টাকা।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক নারী দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি নিয়মিত চট্টগ্রাম থেকে রেলপথে এসব মাদক এনে গৌরীপুরসহ আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় স্থানীয় একটি মাদক সিন্ডিকেট জড়িত থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় যাত্রীরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে মাদক পাচারকারীরা নারী বা কিশোরদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। গোপন প্যাকেটে করে ট্রেনে মাদক বহন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান জানান, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনে মাদকের একটি চালান আসছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ রেলস্টেশন এলাকায় ওৎ পেতে থাকে। ট্রেনটি স্টেশন ছাড়ার পর এক নারীর চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ নজরদারি শুরু করে।

একপর্যায়ে ওই নারী রিকশাযোগে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ তার গতিরোধ করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি রিকশা থেকে লাফ দিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া করে তাকে আটক করা হয়।

ওসি আরো জানান, রিকশা থেকে লাফ দেয়ার সময় তিনি সামান্য আহত হন। পরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

পুলিশের ধারণা, চট্টগ্রাম থেকে আনা এই মাদকের চালানটি ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করার পরিকল্পনা ছিল।

এ ঘটনায় আটক নারীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাছিমা আক্তার জানান, সড়কপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকায় তার মতো মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে বর্তমানে মাদক পাচারের সবচেয়ে নিরাপদ রুট হয়ে উঠেছে রেলপথ।