রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ, লেটার রাইটার শিহাব পলাতক

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধার (৩০) বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক আমানতকারী গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এম মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী

Location :

Rajbari Sadar
রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ, লেটার রাইটার শিহাব পলাতক
রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ, লেটার রাইটার শিহাব পলাতক |নয়া দিগন্ত

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধার (৩০) বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক আমানতকারী গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গ্রাহকের অর্থ লেনদেন ও সঞ্চয় সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার পর হঠাৎ করেই তিনি উধাও হয়ে গেছেন। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা।

পলাতক শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে।

জানা গেছে, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা পোস্ট অফিসে আগত গ্রাহকদের মেয়াদি হিসাব খুলে দেয়ার নাম করে সাদা স্লিপের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে অর্ধশতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে কোটি টাকা গ্রহণ করেন।

পরে সেই টাকা পোস্ট অফিসের কাউন্টারে জমা না দিয়ে তিনি আত্মসাৎ করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় অফিস থেকে পোস্টাল সুপার তদন্তে আসেন। তিনি শিহাব মৃধাকে পোস্ট অফিসে হাতেনাতে পেয়েও পুলিশে সোপর্দ না করে ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর থেকেই শিহাব আত্মগোপনে চলে যান। পোস্ট অফিস থেকে শিহাবের বাড়িতে খোঁজ নিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা এখন অফিসে এসে তাদের টাকা দাবি করছেন। কষ্টার্জিত টাকা হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।

একটি বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, লেটার রাইটার শিহাব মৃধা সম্প্রতি বিদায়ী পোস্টমাস্টার বিকাশ বিশ্বাস ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সাথে যোগসাজশ করে অর্ধশতাধিক গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

এদিকে গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে এ ঘটনা অধিকতর তদন্ত করতে ৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটিতে খুলনার দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিন্টেন্ডেন্ট (তদন্ত)কে সদস্য সচিব, ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (তদন্ত), দক্ষিণাঞ্চল, খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়েছে।

কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ডাক অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও বিধি-বিধানের অপর্যাপ্ততা বা পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটির কারণে সরকারি ক্ষতি সংঘটিত হয়ে থাকলে, তা সংশোধন, নিরসন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে যুক্তিসংগত প্রস্তাব বা সুপারিশসমূহ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের একজন কর্মকর্তা জানান, শিহাব মৃধার একার পক্ষে এত টাকা আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়নি। শিহাব মৃধা ডাকঘরের পোস্টমাস্টারসহ অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগিতা নিয়েই গ্রাহকদের এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

মোনালিসা ইমাম নামের এক ভুক্তভোগী গ্রাহক বলেন, ‘আমি চলতি মাসে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে ২ লাখ টাকার একটি মেয়াদি হিসাব খুলি। পোস্ট অফিসে আসলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা আমার লেখালেখিসহ যাবতীয় কাজ করে দেয়। সে আমাকে জানায়, এক সপ্তাহ বা ১০ দিন পর এসে বই নিয়ে যেতে। কিন্তু আমি ১০ দিন পর পোস্ট অফিসে বই নিতে আসলে পোস্ট অফিস থেকে জানানো হয় আমার নামে কোনো হিসাবই খোলা হয়নি। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি ওই শিহাব মৃধা আমারসহ আরো অনেকের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছে।’

আফজাল হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমরা ডাকঘরের ওপর আস্থা রেখেই টাকা জমা দিয়েছিলাম। এখন এসে শুনছি আমাদের নামে কোনো হিসাবই নেই। জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে আমরা দিশেহারা। দ্রুত টাকা ফেরত ও জড়িতদের শাস্তি চাই।’

আরেক ভুক্তভোগী সালমা বেগম বলেন, ‘ডাকঘরে বসেই শিহাব সব কাগজপত্র পূরণ করতো, তাই তাকে বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছিলাম। এখন সে পালিয়ে গেছে। আমরা চাই সরকার আমাদের টাকা উদ্ধার করে দিক।’

অপর এক ভুক্তভোগী সোহেল রানা বলেন, ‘পোস্ট অফিস একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখানে এসেও আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি।’

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা দ্রুত ফেরত দেয়া এবং এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সদ্য বিদায়ী পোস্টমাস্টার ও বর্তমানে কুষ্টিয়ায় কর্মরত বিকাশ বিশ্বাস বলেন, ‘শিহাব মৃধা লেটার রাইটার পদে পোস্ট অফিসে কাজ করতো। সে কীভাবে এত টাকা আত্মসাৎ করেছে, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, ‘২০২১ সাল থেকে শিহাব মৃধা রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে লেটার রাইটার পদে কাজ করতো। সে সরকারি কোনো কর্মচারী নয়, ডিজি অফিসের নির্দেশে প্রত্যেক পোস্ট অফিসে এমন পদে লোক রয়েছে। গ্রাহকরা রাজবাড়ী পোস্ট অফিসে মেয়াদি হিসাবে টাকা রাখতে আসলে সে লেখালেখিসহ টাকা রাখা এবং বিতরণের কাজ করতো। সে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গ্রাহকদের রাখা টাকা সে আত্মসাৎ করে। গ্রাহকরা যখন তাদের বই পাচ্ছিল না, তখন বিষয়টি জানাজানি হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি গত ৬ জুলাই রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে যোগদান করি। যোগদান করার পরই বিষয়টি আমার নজরে আসে। তখন আমি আমাদের কুষ্টিয়ার প্রশাসনিক অফিসকে অবগত করি। কর্তৃপক্ষ জিডি করতে বললে আমি রাজবাড়ী সদর থানায় একটি জিডি করতে যাই। কিন্তু থানার ওসি আমাদের জিডি না করে মামলা করার পরামর্শ দেন। আমরা রাজবাড়ী অফিস নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, তাই পরে আমি কুষ্টিয়া অফিসকে বিষয়টি জানাই। কুষ্টিয়া অফিস আবার খুলনা সার্কেল অফিসকে বিষয়টি জানায়। খুলনা অফিস এই মুহূর্তে মামলা না করে ঘটনাটি অধিকতর তদন্ত করতে ৪ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষ করে আমাদের যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

একটি সূত্রে জানা গেছে, কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়া শিহাব মৃধা রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে কর্মরত এমএলএসএস (অফিস সহায়ক) রেজাউল আলমের আপন ভাগ্নে।

এছাড়াও জানা গেছে, এই রেজাউলের আপন ভাই মেইল ক্যারিয়ার মো: আলী আক্কাস ২০০৭ সালে পোস্ট অফিসের গ্রাহকদের ১১ লাখের বেশি টাকা নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর মামলা দায়ের হলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং মামলায় তিনি কারাভোগও করেন।