সাইফুর রহমানকে নিয়ে সিসিক প্রশাসকের হৃদয়গ্রাহী স্মৃতিচারণ

‘সিলেটের উন্নয়নের রূপকার এম সাইফুর রহমান : স্মৃতিতে অমলিন, কর্মে চিরঞ্জীব’ শিরোনাম লেখা এই পোস্টে কাইয়ুম চৌধুরী হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেন মরহুম এম সাইফুর রহমানকে।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান
সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান |ফাইল ছবি

২০০১ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া এম সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় তৎকালীন তার রাজনৈতিক সচিব, বর্তমান সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর। সে সময় দেখা সাইফুর রহমানকে নিয়ে তার ১৭তম মৃত্যু বার্ষিকীর দিন আজ ৫ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন কাইয়ুম চৌধুরী।

‘সিলেটের উন্নয়নের রূপকার এম সাইফুর রহমান : স্মৃতিতে অমলিন, কর্মে চিরঞ্জীব’ শিরোনাম লেখা এই পোস্টে কাইয়ুম চৌধুরী হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেন মরহুম এম সাইফুর রহমানকে।

ফেসবুকে লেখা তার পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল :
‘আজ ৫ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম নেতা, ভাষাসৈনিক এবং সিলেটের উন্নয়নের অন্যতম রূপকার এম সাইফুর রহমানের ১৭তম শাহাদাৎবার্ষিকী।

২০০৯ সালের এই দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারান। দেখতে দেখতে ১৭টি বছর পেরিয়ে গেছে। সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে, অনেক স্মৃতি ধূসর হয়েছে। কিন্তু এম সাইফুর রহমানের স্মৃতি সিলেটবাসীর হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, তার কর্ম ও অবদানের মূল্যায়ন ততই গভীর হয়েছে।

এম সাইফুর রহমান ছিলেন দূরদর্শী, স্পষ্টভাষী, সাহসী ও কর্মনিষ্ঠ একজন রাজনীতিক। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সংস্কার ও আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে নিতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশের অন্যতম দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী অর্থমন্ত্রী এবং মোট ১২টি জাতীয় বাজেট উপস্থাপনকারী অর্থমন্ত্রী হিসেবে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল দৃঢ় ও সাহসী। মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট প্রবর্তন, বাণিজ্য উদারীকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও বেসরকারিকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপের সাথে তার নাম গভীরভাবে যুক্ত। দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে তিনি অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন।

কিন্তু সিলেটের মানুষের কাছে এম সাইফুর রহমানের পরিচয় শুধু একজন অর্থমন্ত্রী হিসেবে নয়। তিনি ছিলেন সিলেটের উন্নয়ন ও সম্ভাবনার একজন অকুতোভয় স্বপ্নদ্রষ্টা। শিক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামো, ক্রীড়া ও সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার উদ্যোগের কথা আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। সিলেটকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রত্যয় তার মধ্যে ছিল, সেটিই তাকে সিলেটবাসীর কাছে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।’

পোস্টে তিনি লেখেন, ‘২০০১ সালে তিনি যখন দেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এটি শুধু আমার কর্মজীবনের একটি দায়িত্ব ছিল না; আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাও ছিল। একজন জাতীয় নেতার এতটা কাছাকাছি থেকে কাজ করা, তার কর্মপদ্ধতি দেখা এবং তার চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কাছ থেকে উপলব্ধির করার সুযোগ আমার হয়েছিল।

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে সেই সময়ের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। তার মধ্যে আমি দেখেছি দায়িত্বের প্রতি গভীর নিষ্ঠা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা এবং নিজের বিশ্বাসের ওপর অটল থাকার এক বিরল মানসিকতা। কাজের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠোর ও আপসহীন; কিন্তু মানুষের প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল গভীর। বিশেষ করে সিলেটের মানুষের কথা উঠলে তার আগ্রহ ও দায়বদ্ধতার মাত্রা যেন আরও বেড়ে যেত।’

তিনি এতে উল্লেখ করেন, ‘রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তার সাথে কাজ করার সময় একটি বিষয় আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে—সিলেটের উন্নয়ন তার কাছে কখনোই কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় ছিল না। এটি ছিল তার চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিলেটের সমস্যা, সম্ভাবনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, অবকাঠামো—এসব নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল বাস্তবমুখী। তিনি সিলেটকে পিছিয়ে থাকা কোনো অঞ্চল হিসেবে দেখতে চাইতেন না; তিনি দেখতে চেয়েছিলেন সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে।’

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে কাইয়ুম চৌধুরী লিখেন, ‘তার কাছ থেকে কাজের যে শিক্ষা পেয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দায়িত্ববোধ। একটি দায়িত্ব গ্রহণ করা মানে শুধু সেই দায়িত্বের আনুষ্ঠানিকতা পালন নয়—তার সাথে মানুষের প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতাকেও ধারণ করা। তার কর্মজীবনের দিকে তাকালে সেই দর্শনের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

তিনি ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক, যিনি রাজনীতিকে কখনোই ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে দেখেননি। তার কাছে রাজনীতি ছিল মানুষের কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম। অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো কঠিন বিষয়েও তার দৃঢ় অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা সেই মানসিকতারই প্রকাশ।

কাইয়ুম চৌধুরী লিখেছেন, ‘তার মৃত্যুর ১৭ বছর পরও সিলেটের উন্নয়নের ইতিহাসে তার নাম উচ্চারিত হয়। নগরসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ, শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামো এবং তার সময়ের নানা কর্মকাণ্ডের সাথে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একজন মানুষ চলে যান, কিন্তু তার কর্মের যে ছাপ মানুষের জীবন ও একটি অঞ্চলের ইতিহাসে থেকে যায়, সেটিই তাকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখে।

আজ তাকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হচ্ছি। কারণ আমি তাকে শুধু একজন দূর থেকে দেখা জাতীয় নেতা হিসেবে স্মরণ করছি না। আমি তাকে স্মরণ করছি এমন একজন মানুষ হিসেবে, যার সাথে আমার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় জড়িয়ে আছে। তার সাথে কাজ করার সুযোগ, তার কাছ থেকে শেখার সুযোগ এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের একটি মূল্যবান অধ্যায় হয়ে থাকবে।’

পোস্টে তিনি বেদনাবিধুর স্মৃতি চারণ করে বলেন, ‘সময় চলে যায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের উপস্থিতি তাদের মৃত্যুর পরও অনুভব করা যায়। এম সাইফুর রহমান তেমনই একজন মানুষ। তার কণ্ঠস্বর হয়তো আজ আর শোনা যায় না, তার সাথে কর্মব্যস্ত সেই দিনগুলোও আজ অতীত; কিন্তু তার কাজ, তার চিন্তা এবং তার রেখে যাওয়া স্মৃতি আজও আমাদের সাথে কথা বলে।

তাই এম সাইফুর রহমানকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রয়াত নেতাকে স্মরণ করা নয়। তাকে স্মরণ করা মানে তার কর্মকে স্মরণ করা, তার সাহসী সিদ্ধান্তকে স্মরণ করা, তার দূরদর্শিতাকে স্মরণ করা এবং সবচেয়ে বড় কথা—সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে তার স্বপ্নকে স্মরণ করা।

তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা শুধু স্মরণসভা কিংবা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তার কর্মনিষ্ঠা, সততা, সাহস ও দূরদর্শিতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হতে পারে তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় সম্মান।

১৭তম শাহাদাৎবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি আমার প্রিয় নেতা এম সাইফুর রহমানকে।

স্মৃতিতে অমলিন, কর্মে চিরঞ্জীব—এম সাইফুর রহমান।

মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।’