প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি ও দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন নগরী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে ছিল তুলনামূলক কম পর্যটকের উপস্থিতি। অন্যান্য ঈদ উৎসবের ছুটিতে যেখানে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়, সেখানে এবার অতিরিক্ত চাপ না থাকায় স্বস্তিতে ও নির্বিঘ্নে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা শ্রীমঙ্গলে এলেও ভিড় ছিল সহনীয় পর্যায়ে। ফলে চা-বাগান, বধ্যভূমি-৭১, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, সাতরঙা চা এবং অন্যান্য পর্যটন স্পটগুলোতে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় ছিল। পর্যটকদের দীর্ঘ সময় যানজট, টিকিট সংগ্রহ কিংবা অতিরিক্ত ভিড়ের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি।
ভ্রমণে আসা কয়েকজন পর্যটক জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার শ্রীমঙ্গলে অনেকটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ বিরাজ করেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে নির্বিঘ্নে ঘোরাঘুরি করা গেছে এবং দর্শনীয় স্থানগুলো উপভোগ করার সুযোগও ছিল বেশি।
স্থানীয়দের মতে, পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নির্মল পরিবেশ ও সবুজ চা-বাগানের আকর্ষণ ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে সবসময়ই বিশেষ আবেদন তৈরি করে। ফলে যারা এসেছেন, তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
ঢাকার মানিকগঞ্জ থেকে সহকর্মী শিক্ষকদের নিয়ে ভ্রমণে আসা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: শহিদুল্লাহ জানান, প্রথমবারের মতো ভ্রমণে এসে এখানকার প্রাকৃতিক মনোমুগদ্ধকর অপরূপ দৃশ্য দেখে ভালোই লেগেছে। সব স্পটেই পর্যটকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। রাস্তাঘাটের কিছু সমস্যা ছাড়া তিনি পরিবেশে সন্তুষ্ট প্রকাশ করে পরবর্তি সময়ে পরিবার নিয়ে চায়ের রাজ্যে ভ্রমণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পাঁচ ভাই-বোনের পরিবার নিয়ে কুমিল্লা থেকে বেড়াতে আসা জাহিদ হাসান বলেন, এর আগেও তিনি শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসেছেন। এবার একটি বাস ভাড়া করে ভাই-বোনের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদের ছুটি কাটাতে শ্রীমঙ্গল বেড়াতে এসেছেন। অন্যান্য সময়ের তুলনায় এবারের ভ্রমণটি স্বস্তিদায়ক হয়েছে জানিয়ে তিনি কিছু অটোচালকরা অতিরিক্ত ভাড়া চাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের আগমন ছিল সন্তোষজনক। তবে অতিরিক্ত ভিড় না থাকায় পর্যটকরা আরামদায়ক পরিবেশে সময় কাটাতে পেরেছেন। অনেক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টে পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
এ ব্যাপারে হোটেল রিসোর্ট মালিকদের সংগঠন পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মো: সেলিম আহমেদ নয়া দিগন্তকে জানান, ঈদের দিন পর্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়া থাকায় এবং হাম ও সামনে এসএসসি পরীক্ষার কারণে পর্যটকের চাপ কিছুটা কম অন্যান্য বছরের তুলনায়। তারপরও তিনি সন্তুষ্ট প্রকাশ করে ৮০-৯০ পারসেন্ট হোটেল/রিসোর্ট কক্ষ ভাড়া হয়েছে বলে জানান।
পাঁচ তারকা মানের হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জিএম মো: আরমান খান জানান, ঈদের পর থেকে পর্যটকের উপস্থিতি সন্তোষজনক। ৯০ পার্সেন্ট কক্ষে গেস্ট অবস্থান করছেন। তবে গত ঈদের তুলনায় পর্যটকের চাপ কিছুটা কম।
ট্যুর গাইড পঙ্কজ জানান, প্রতিবছরের মতো এবারো প্রচুর সংখ্যক পর্যটক পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসেছেন। বিভিন্ন স্পটে বেশ ভালোই গেদারিং লক্ষ্য করা গেছে।
লাউয়াছড়া ইকো ট্যুর গাইড ও পরিবেশকর্মী সাজু মারছিয়াং নয়া দিগন্তকে জানান, ঈদের দিন লাউয়াছড়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা কম থাকলেও ঈদের পরের দুই দিন উপচেপড়া ভিড় ছিল। রোববারেও বিপুল সংখ্যা পর্যটকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশী পর্যটক দেখা গেছে।
লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: কাজী নাজমুল হক নয়া দিগন্তকে জানান, ঈদের ৩য় দিন (শনিবার) পর্যন্ত লাউয়াছড়ায় ১৭ জন বিদেশী পর্যটকসহ মোট ২৬৩৬ জন দর্শনার্থী জাতীয় উদ্যানে টিকিট কেটে প্রবেশ করেছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৭ টাকা। তবে বোরবারের পরিসংখ্যান সন্ধ্যার যোগ করলে আরো বাড়বে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: জিয়াউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ যৌথভাবে যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে তাতে পর্যটক ও জনগনের চলাচলে একটা স্বস্তি এবারের ঈদের ছুটিতে পরিলক্ষিত হয়েছে। এছাড়া শহরের বর্জ্য ও কোরবানির চামড়া দ্রততম সময়ে ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করায় শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া আমি নিজেই শহর ঘুরে ঘুরে এ কাজগুলো তদারকি করেছি, যা এখনো অব্যাহত আছে।’
সব মিলিয়ে এবারের ঈদুল আজহার ছুটিতে শ্রীমঙ্গল ছিল অনেকটাই স্বস্তির পর্যটন গন্তব্য। অতিরিক্ত ভিড়ের চাপ না থাকায় দর্শনার্থীরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে নির্ভার সময় কাটাতে পেরেছেন, যা তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে করেছে আরো আনন্দময় ও স্মরণীয়- এমনটাই জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।



