ময়মনসিংহকে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে ডিসির ক্লিন সানডে অভিযান

জেলা প্রশাসক মো: সাইফুর রহমান বলেন, ‘একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলা একদিনের কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জনসচেতনতা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমরা চাই পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ সারা দেশের জন্য একটি অনুসরণীয় মডেলে পরিণত হোক।’

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও স্বাস্থ্যসম্মত জেলায় রূপান্তরের লক্ষ্যে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো: সাইফুর রহমান। তার ঘোষিত ক্লিন সানডে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর, বাজার ও জনপরিসরে শুরু হয়েছে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। ইতোমধ্যে জেলা সদর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসন এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে।

বৃহষ্প‌তিবার (২৩ জুলাই) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্য নিয়ে প্রথম পর্যায়ে নগরীর নওমহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো: সাইফুর রহমান। তিনি অভিভাবক সমাবেশে অংশ নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লিন সানডে কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আপনার সচেতনতাই আগামী প্রজন্মের সুস্থতা। আসুন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি, রোগমুক্ত ও সুন্দর সমাজ গড়ি।’

তিনি জেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি রোববার নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেন এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

পরে সদর উপজেলার দাপুনিয়া কাওয়ালটি উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ এবং দাপুনিয়া কাওয়ালটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই কর্মসূচি পালন করেন জেলা প্রশাসক। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করেন, শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন করেন এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেন। শিক্ষার্থীদের লাল, নীল ও কালো রঙের পৃথক বর্জ্য বিন ব্যবহারের মাধ্যমে উৎসেই বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখার কৌশল শেখানো হয়।

জেলা প্রশাসক প্রতিটি বিদ্যালয়ে ক্লিন স্কুল টিম গঠনের নির্দেশ দিয়ে মো: সাইফুর রহমান বলেন, ‘এসব টিম নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ, টয়লেট, বারান্দা, খেলার মাঠ ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা তদারকি করবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা অপসারণ, ডেঙ্গুর লার্ভা বিস্তার রোধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা নিশ্চিত করতেও তারা ভূমিকা রাখবে।’

তিনি বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের সামাজিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধ বিদ্যালয় থেকেই গড়ে তুলতে হবে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাই বিদ্যালয় থেকেই পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’

জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। নান্দাইলে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাভার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে। একইসাথে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, আগামী থেকে উপজেলার সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসায় প্রতি রোববার ক্লিন সানডে কর্মসূচি পালিত হবে।

সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আকুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। একইসাথে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মান ও রিডিং স্কিলও পর্যালোচনা করা হয়।

গফরগাঁওয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এন এম আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে খারুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়।

মুক্তাগাছা উপজেলার নবারুণ বিদ্যানিকেতনে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একই কর্মসূচি পালিত হয়। পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

অন্যদিকে এ কর্মসূচির আওতায় জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। খালবলা বাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সাখুয়া বিদ্যানিকেতন, চরজিথর উচ্চ বিদ্যালয়, মহেশপুর দাখিল মাদরাসা, মল্লিকপুর লক্ষীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, সোহাগী ইউনিয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাজীর বলসা দাখিল মাদরাসা এবং আঠারবাড়ী এমসি উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, পরিচ্ছন্নতার এই উদ্যোগ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে জনসমাগমস্থল ও বাজারেও। হালুয়াঘাট উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৌর বাজারে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইউএনও ফয়সাল আহমেদ ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকিয়া সুলতানা রোজির নেতৃত্বে বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তা, পৌরসভা, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বাজার পরিষ্কার করা হয় এবং সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার আহ্বান জানানো হয়।

এদিকে, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আয়োজনে কৃষক কার্ডের জন্য অ্যাপভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমও শুরু হয়। সদর উপজেলার খাগডহর ইউনিয়নের মাইজবাড়িতে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রান্তিক কৃষকদের তথ্যভান্ডার প্রস্তুত এবং সরকারি সেবার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ক্লিন সানডে শুধু একটি পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ববোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক অংশ নেয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন। ভবিষ্যতে জেলার সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর, আবাসিক ভবন, বাজার ও জনপরিসরে নিয়মিত এই কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।

জেলা প্রশাসক মো: সাইফুর রহমান বলেন, ‘একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলা একদিনের কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জনসচেতনতা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমরা চাই পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ সারা দেশের জন্য একটি অনুসরণীয় মডেলে পরিণত হোক।’