জ্বালানি তেলের পর এবার সিলেটে ভোজ্যতেলের বাজারে চলছে সঙ্কট। এতে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে কিনছেন তেল। এখন পর্যন্ত সিলেটের বাজারে ভোজ্যতেলের সঙ্কট নিয়ে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। এতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির পায়তারা করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দোহাই দিয়ে অস্থিতিশীল হওয়া জ্বালানি তেলের বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এবার ভোজ্যতেলের সঙ্কট শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা বললেও স্থানীয় পর্যায়ে দেখা গেছে এর উল্টো চিত্র। সিলেটের বাজারে মিলছে না সয়াবিন তেল। কোথাও কোথাও সঙ্কটের কথা বলে বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে।
এদিকে আগামী রোববার (১২ এপ্রিল) থেকে বাজার মনিটরিংয়ের ঘোষণা দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও কৃষি বিপণন অধিদফতর।
গত শুক্রবার নগরীর একাধিক বাজারের কয়েকটি মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সয়াবিন তেলের সঙ্কটে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই। বেশিভাগ দোকানে বোতলজাত ভোজ্যতেল নেই। তবে সুপার শপগুলোতে কম-বেশি তেল পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে আট থেকে ১০টি মুদি দোকান খুঁজেও তেল পাওয়া যায় না। পেলেও বিক্রেতারা দাম বেশি রাখেন। বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল কিনতে গুণতে হচ্ছে ২১০ থেকে ২১৫ টাকা। যদিও তেলের বোতলের দাম ১৯৫ টাকা।
জানা গেছে, ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সঙ্কট প্রতিরোধে দেশজুড়ে সমন্বিত অভিযানে নেমেছে র্যাব। একদিনে ২০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মোট এক লাখ ৬৫ হাজার ২৫ লিটার ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মজুদ শনাক্তের পর জব্দ করা হয়। এরমধ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জ সদর থেকে বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল জব্দ করেছে র্যাব। এছাড়া শুক্রবার সিলেট ও সুনামগঞ্জে ভোজ্যতেলের মজুদের সন্ধানে অভিযান চালিয়েছে র্যাব-৯। গেল রমজান ও ঈদের শুরুতে দেশব্যাপী ভোজ্যতেলের সঙ্কট শুরু হয়। মাঝখানে কিছুটা স্বাভাবিকও হয়। তবে জ্বালানি তেলের সঙ্কটকে পুঁজি করে ফের দেশব্যাপী শুরু হয় ভোজ্যতেলের সঙ্কট।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ফের তেলের দাম বাড়াতেই বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি। অন্যদিকে, প্রায় মাসখানেক ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে রোজার আগে বাড়তে শুরু করা তেলের দাম ঈদের পর আরো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এবার নানা অজুহাতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে সয়াবিনের বাজার। ফলে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর। বিক্রেতাদের দাবি, মিলগেট পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সঙ্কটের অজুহাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তেই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
এদিকে, প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চাহিদা মতো সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না খুচরা ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেল নিতে মানতে হচ্ছে অন্য পণ্য নেয়ার শর্ত। তেল নিয়ে এমন তেলেসমাতির সুযোগে ক্রেতা পড়েছেন বিপাকে। কেউ কিনছেন চাহিদার অতিরিক্ত তেল, কেউ আবার সয়াবিন তেলের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরছেন।
জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বাড়ানোর জন্য বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে এক ধরনের চাপ তৈরি করেছেন। তারা প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারের কাছে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা। এছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম এক হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল বর্তমান নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন না দিলেও বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে খোলা তেল।
এ বিষয়ে সিলেটের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আবুল সালেহ মো: হুমায়ুন কবির দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে ভোজ্যতেলের বাজারের সচিত্র প্রতিবেদন সংগ্রহের জন্য আমাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমি বৃহস্পতিবার সিলেটের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার সাথে কথা বলেছি। সবাই বলছে, কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য দাম বৃদ্ধি করা। ফলে কোম্পানিগুলো চাহিদার ১০ থেকে ১৫ ভাগ তেল বাজারে সরবরাহ করছে। এতে খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতারা চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। আমি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন রেডি করেছি। সেটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করব।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক দেবানন্দ সিনহা দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সিলেটের বাজারে ভোজ্যতেলের সঙ্কটের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কেন্দ্র থেকে বাজার পরিস্থিতির চিত্র জানতে চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। রোববার থেকে সিলেটের বাজারে অভিযান শুরু হবে।’
কারো কাছে তেল মজুদের তথ্য থাকলে বা বেশি মূল্য রাখলে ভোক্তা অধিদফতরকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।



