উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

পরিবর্তনের জন্য দেশবাসীকে গণভোটে অংশ নেয়ার আহ্বান

চতুর্থ সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ ছয় হাজার ১৯৩ জন গ্র্যাজুয়েটকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য ১৫ জন শিক্ষার্থীকে চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল, ভাইস-চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল, ফাউন্ডার গোল্ড মেডেল ও কো-ফাউন্ডার গোল্ড মেডেল প্রদান করা হয়।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
বেসরকারি লিডিং ইউনিভার্সিটির চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য দিচ্ছেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
বেসরকারি লিডিং ইউনিভার্সিটির চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য দিচ্ছেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান |নয়া দিগন্ত

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘পরিবর্তনের জন্য দেশবাসীকে গণভোটে অংশ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আগামী নির্বাচনে বুঝেশুনে প্রার্থী নির্বাচন করবেন, যাতে আগামী পাঁচ বছর আফসোস করতে না হয়। আপনারা ভয় পাবেন না, সাহসের সাথে এগিয়ে যান। পতিত স্বৈরাচার দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, ভয় পাবেন না।’

তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের জন্য কমিটেড, হাদির বিচারের জন্য কমিটেড। এ সরকারের আমলেই হাদির বিচার কাজ শেষ করা হবে। হাদি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য স্বপ্ন দেখেনি, সে দেশের পরিবর্তনের জন্য স্বপ্ন দেখেছে। তাই শুধু নিজের জীবনের ফোকাস ঠিক করবেন না, সমাজের ফোকাসটা ঠিক করবেন। পড়াশোনা করে শুধু বাড়ি-গাড়ির চিন্তা করবেন না। সমাজের জন্যও চিন্তা করবেন।’

শনিবার (৩ জানুয়ারি) দুপুর ১টার দিকে সিলেট শহরতলীর দক্ষিণ সুরমার রাগীবনগরে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি লিডিং ইউনিভার্সিটির চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম দেশ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছে। আপনারাই শিখিয়েছেন কীভাবে দেশ গড়তে হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আপনারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আপনারাই স্বপ্ন দেখিয়েছেন কীভাবে স্বৈরাচারমুক্ত দেশ গড়তে হয়। তরুণ প্রজন্মই ফ্যাসিস্ট শাসকমুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে উত্তরণ ঘটিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আজকে অনেকেই হাদির বিচারের জন্য দাঁড়িয়েছেন, সে একটা দীপ্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠন না হলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ সফল হবে না। আপনাদের মাধ্যমেই মানবিক মূল্যবোধ বাংলাদেশ গঠন হবে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঐক্য গড়ে উঠছিল মন্তব্য করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তাহলে ফ্যাসিস্টরা সুযোগ পাবে না। অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, সবাইকে বিতর্কিত করতে চায় পতিত শক্তি। আমাদেরকে সহনশীল হতে হবে। এতটা বছর আমরা একটা চর্চা করেছি, রাতারাতি পরিবর্তন হবে না, একটু সময় লাগবে।’

রাজনৈতিক দলগুলোকে ইতিবাচক রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে। আপনারা ইতিবাচক রাজনীতি করলে বাংলাদেশে যে পরিবর্তন দেখতে চেয়েছি, সেই রকম বাংলাদেশ হবে।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে পরিবর্তন শুরু হোক, তাহলে সমাজটা বদলে যাবে। অভ্যাস পরিবর্তন নিজে থেকে শুরু করতে হবে, তাহলে সমাজ বদলাবে। আপনি নিজে অযথা হর্ন বাজাবেন না, নিজে থেকে শুরু করেন। দেখেন সমাজ বদলাবেই।’

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘হাওর বাংলাদেশের একমাত্র ইকোসিস্টেম। হাওরকে রক্ষা করতে হবে। হাওর ভরাট করে বিশ্ববিদ্যালয় করা যাবে না। যেটা সৃষ্টি করতে পারবেন না, সেটা ধ্বংস করার অধিকার নেই। আল্লাহর সৃষ্টি অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রতিষ্ঠান করবেন।’

সমাবর্তন বক্তা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, ‘পৃথিবীর অবস্থা ভালো নয়। কোরআনে আছে, পৃথিবী নিয়ে তামাশা করো না। অথচ আমরা পৃথিবী নিয়ে ছিনিমিনি খেলছি। আমরা উত্তপ্ত পৃথিবী পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি। এখানে গ্রিনহাউজ গ্যাসের কার্বন অনেক বেশি। আমি আশা করব, লিডিং ইউনিভার্সিটি পরিবার জলবায়ু নিয়ে কাজ করবে, পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়নে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণায় জোর দিতে হবে। সেই মোতাবেক অ্যাকাডেমিক কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়কে আউটকাম বেইজড কারিকুলাম প্রণয়ন করা জরুরি। সিলেট চা শিল্পের জন্য বিখ্যাত, এখানে শতাধিক চা বাগান রয়েছে। তাই এসব চা শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মোতাবেক দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে লিডিং ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান, শিল্পপতি ড. সৈয়দ রাগীব আলী বলেন, ‘জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করতে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদেরকে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জোর দিতে হবে। লিডিং ইউনিভার্সিটি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

স্বাগত বক্তব্যে লিডিং ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন বলেন, ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। আর সেই দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি গড়ে তুলতে কাজ করছে লিডিং ইউনিভার্সিটি। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কারিকুলাম প্রণয়ন করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বশির আহমেদ ভুঁইয়া, আধুনিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কামরুল আলম, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম প্রমুখ।

চতুর্থ সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ ছয় হাজার ১৯৩ জন গ্র্যাজুয়েটকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য ১৫ জন শিক্ষার্থীকে চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল, ভাইস-চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল, ফাউন্ডার গোল্ড মেডেল ও কো-ফাউন্ডার গোল্ড মেডেল প্রদান করা হয়।

এ সময় গ্র্যাজুয়েটদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ অতিথিরা।

এর আগে, একইদিন সকালে সিলেট প্রেসক্লাবে নির্বাচনকালিন সাংবাদিকতা বিষয়ক দু’দিনের কর্মশালা উদ্বোধন করেন তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।