১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু, বনদস্যু আতঙ্কে মৌয়ালরা

মৌয়ালদের দাবি, বাঘের চেয়েও বনদস্যুদের নির্যাতন বেশি ভয়ংকর। দস্যুরা তাদের আটক করে মধু ও মাছ ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া মুক্তিপণের জন্য মোটা অংকের অর্থ দাবি এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা

Location :

Koyra

মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) থেকে সুন্দরবনে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। টানা দুই মাস ধরে চলবে এ কার্যক্রম। সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে খলিশা, বাইন, গেওয়া, পশুরসহ নানা প্রজাতির ফুলে গড়ে ওঠা ছোট-বড় মৌচাক থেকে মৌয়ালরা মধু ও মোম সংগ্রহ করবেন।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার অধিকাংশ মানুষ জীবিকার জন্য বননির্ভর। প্রতিবছরের মতো এবারও এসব এলাকার বহু মৌয়াল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করছেন। তবে অতীতে বাঘের আক্রমণের ভয় থাকলেও চলতি মৌসুমে তাদের প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে বনদস্যুদের উৎপাত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। ফলে জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন, এতে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।

মৌয়ালদের দাবি, বাঘের চেয়েও বনদস্যুদের নির্যাতন বেশি ভয়ংকর। দস্যুরা তাদের আটক করে মধু ও মাছ ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া মুক্তিপণের জন্য মোটা অংকের অর্থ দাবি এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সুন্দরবন পশ্চিমের খুলনা রেঞ্জে ৭০০ কুইন্টাল মধু ও ২১০ কুইন্টাল মোম এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে গত কয়েক বছরে মধু আহরণে ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও কমে হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়। তবে অবৈধভাবে সংগৃহীত মধু এ হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

মৌসুমের শুরুতে খলিশা ফুলের মধু পাওয়া যায়, যা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও দামি। এরপর পর্যায়ক্রমে গরান, কেওড়া ও ছইলা ফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। তবে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় এ বছর কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মধু পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।

কয়রার মৌয়াল মোকছেদ আলী বলেন, “এলাকায় কাজ না থাকায় ধারদেনা করে বনে যাচ্ছি। মধু না পেলে ঋণের বোঝা বাড়বে। আবার দস্যুদের হাতে পড়লে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।”

আরেক মৌয়াল আমিরুল ইসলাম বলেন, “এ বছর দস্যুদের উৎপাতের কথা শুনে খুব ভয় লাগছে। চালান নিরাপদে ফিরবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কায় আছি। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে হয়তো বনে যেতাম না।”

কয়রা কেয়ার ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাষক মোহসিন আলম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ জীবিকার তাগিদে বাঘ, কুমির ও সাপের ঝুঁকি নিয়ে মধু সংগ্রহ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালদের পেশা হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান।

এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে নির্বিঘ্নে মধু আহরণের জন্য বন বিভাগের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মৌয়ালদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।