চট্টগ্রামের ১৬ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হবে বিএনপি ও জামায়াত জোট

ভোটের মাঠে জোটবদ্ধতা বিএনপিরও আছে, আবার জামায়াতেরও আছে। জনগণ কাকে বেছে নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ভোটাররাই কোন জোট দেশের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, জনগণের পক্ষে তা রায়ের মাধ্যমে বাছাই করবে।

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো

Location :

Chattogram
চট্টগ্রামের ম্যাপ
চট্টগ্রামের ম্যাপ |ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের আর মাত্র একদিন বাকি। শেষ সময়ে এসেও নির্বাচনী জোটের সমীকরণ এখনো চলছে। ইতোমধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়াতে জামায়াত ঘনিষ্ঠতা যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন। তবে জোট রক্ষা করতে গিয়ে কয়েকটি আসনে মাঠের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় না নিয়েই জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে শরীকদের আসন ছেড়ে দেয়ার অসন্তোষও আছে। জোটের সমীকরণে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের কয়েকটি আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা অনেকটা নির্ভর মনে করলেও অধিকাংশ আসনেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে দলটিকে। একই সাথে গণভোট নিয়ে অস্পষ্ট অবস্থান নিয়েও ভোটারদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিএনপিকে।

চট্টগ্রামে সংসদীয় আসন সংখ্যা ১৬টি। এতদিন সবগুলো বিএনপির সাথে জামায়াতের প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জোটের সমীকরণে মাঠ চষে বেড়ানো অনেক প্রার্থীকেই সরে যেতে হচ্ছে দলের সিদ্ধান্তে।

চট্টগ্রামের ১৬টি আসনেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এরমধ্যে আবার কয়েকটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীও রয়েছেন। বিশেষ করে বাঁশখালী ও চন্দনাইশ আসনে নিজ দলের বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জও সামলাতে হবে বিএনপিকে।

এদিকে গত ১৫ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের (বর্তমানে ১০ দল) আসন সমঝোতার পর চট্টগ্রামে ভোটের মাঠের সমীকরণ অনেক ক্ষেত্রেই পাল্টে গেছে। জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটের আসন সমঝোতায় চট্টগ্রামে ১৬ আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০ আসন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিজেদের জন্য রেখে ছয় আসন ছেড়ে দিয়েছে জোটের অপর পাঁচ শরীক দলকে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, চট্টগ্রামে যে ১০টি আসন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্য রাখা হয়েছে সেগুলো হলো চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই), চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি), চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ), চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড ও আকবরশাহ), চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান), চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া), চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী ও হালিশহর), চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা), চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া) এবং চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী)। এসব আসনে বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া চট্টগ্রামে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অপর শরিক দলের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও) আসনে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) ও চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সাথে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী মো: জোবাইরুল হাসান আরিফের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে বলে জানিয়েছেন এ আসনের ভোটাররা।

এদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়াতে বেশ উৎফুল্ল জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর সমর্থকরা। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভোটের মাঠে ইসলামী আন্দোলনের তেমন কোনো অবস্থানই নেই। সংগঠনটির প্রার্থী চট্টগ্রাম সিটির মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোট পেয়েছিল মাত্র পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। অথচ চারটি সংসদীয় আসন মিলে এ সিটি কর্পোরেশন।

জামায়াত ঘনিষ্ঠ ১০ দলের একাধিক নেতার অভিযোগ, ভোটের মাঠে যাদের অবস্থান একেবারেই দুর্বল, শুধুমাত্র কয়েকটি মিছিল সমাবেশের উপস্থিতি দেখেই তাদের অতিমূল্যায়ন করা হচ্ছিল। যার সুযোগ নিতে চেয়েছিল দলটি। তাছাড়া তারা জোটে থাকলে যেসব আসন ছেড়ে দিতে হতো, তা অনেকটা বিরোধীদের ওয়াকওভার দেয়ার মতো হতো বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। অনেকে আবার জোট ছেড়ে যাওয়া দলটির উপর বিদেশী অ্যাজেন্ডার প্রভাব ছিল বলেও দাবি করেছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জোটের সমীকরণে শুরুতে একটা নীতি ছিল যে, মাঠ জরিপ করে যে আসনে যে দলের প্রার্থীর মজবুত অবস্থান থাকবে আসনটি সেই দলকে দেয়ার। কিন্তু আমরা সবক্ষেত্রে সেই নীতিতে দৃঢ় থাকতে পারিনি। সমঝোতার মূল লক্ষ্য হলো জুলাই শহীদদের স্বপ্ন পূরণে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ করা। নিরপেক্ষ মাঠ জরিপ করে সমমনা দলগুলোর যেখানে যে প্রার্থীর সম্ভাবনা বেশি, তাকে সেখানে বাছাই করতে পারলে লক্ষ্য অর্জনের সহায়ক হতো। দলীয় কোটা পূরণ করতে গিয়ে অনেক জায়গায় মজবুত প্রার্থীকে সরিয়ে দেয়ায় সমঝোতার উদ্দেশ্য পূরণে কিছুটা বেগ পেতে হবে। তারপরও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে হবে। ইনশাআল্লাহ।’

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ভোটের মাঠে জোটবদ্ধতা বিএনপিরও আছে, আবার জামায়াতেরও আছে। জনগণ কাকে বেছে নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।’ ভোটাররাই কোন জোট দেশের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, জনগণের পক্ষে তা রায়ের মাধ্যমে বাছাই করবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপি মুক্তিযোদ্ধার দল।’

ভোটের মাঠে বিএনপির মজবুত অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। গত ১৫ বছর ভোটাররা পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। কাজেই ভোটাররা এবারের নির্বাচনে পছন্দসই প্রার্থী বেছে নেবেন।’