তিন বছর আগেও হাওরে কৃষকের ফসল ডুবে গিয়েছিল। উজানের ঢলে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তখন পানি ঢুকে যায় আধা-পাকা বোরো ধানের জমিতে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় কৃষকের। এবার ফসল নষ্ট হলো হঠাৎ বৃষ্টিতে, বৈশাখের শুরুতে এত বৃষ্টিপাত হাওরে আগে কখনো হয়নি। ফলে যা হবার তাই হল—সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা, ডুবে যায় মাইলের পর মাইল ফসলি জমি। ধান হারিয়ে কাঁদতে থাকে কৃষক। ভারী হয়ে যায় হাওরের আকাশ।
করিমগঞ্জের গুণধর ইউনিয়নের খয়রত গ্রামের কৃষক মো: ইসরাইল মিয়া (৭৬) পঞ্চাশ বছর ধরে ধান চাষ করেন। নিকলীর ভাটিবরাটিয়া ও রানিকান্দি হাওরে তাদের বোরো ধানের জমি।
তিনি বলছিলেন, ‘হাওরে আগে বাঁধ ভাইঙ্গা বহুত মানুষের ধান গেছে, কয়েক বছর আমারও খেত নষ্ট হইছে। এইবার মেঘের (বৃষ্টি) পানিতে সবার ধান ডুইব্বা গেছে। এইরকম আগে আর কোনো সময় অইছে না। চৈত মাসের শেষ থাইক্কা এই যে মেঘ শুরু অইছে, আর থামতাছে না। অহন বাঁধ ভাইঙ্গাও ধান তল-হয, মেঘের পানিতেও ধান নষ্ট হয়।’
শুধু ইসরাইল মিয়া নন, হাওরের শত শত কৃষক এরকম কথা জানান।
হাওর অঞ্চলের হাজারো কৃষকের মতো ইসরাইল মিয়ার পরিবারও পুরোপুরি নির্ভরশীল বোরো ধানের ওপর। ভৌগোলিক বাস্তবতায় বছরে এক মৌসুমে এই একটি ফসলই চাষ করা সম্ভব হয় অধিকাংশ হাওরে। সেই বোরো ধানই এবার অতিবৃষ্টি ও দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে অনেক কৃষকের পুরো বছরের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এপ্রিল শেষের অতিবর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে প্লাবিত হয়েছে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল। ঠিক ধান কাটার মুহূর্তে আকস্মিক এ দুর্যোগে ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা।
কৃষিবিদ, আবহাওয়াবিদ, পানিবিশেষজ্ঞ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ফসলের এই ক্ষতির জন্য দায়ি করছেন এপ্রিলের অকাল বৃষ্টিকে। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর দেশে এপ্রিল মাসে এত বৃষ্টি আর হয়নি। এপ্রিল মাস দেশের সবচেয়ে উষ্ণ সময় হিসেবে পরিচিত। তবে এ সময়ে এমন অতিবৃষ্টির জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না।
তারা জানায়, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই হাওরে বৃষ্টি শুরু হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়। মাসের শেষ দিকে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও বৃষ্টির রেশ এখনো রয়ে গেছে।
তারা আরো জানায়, গেল এপ্রিল মাসে হাওর অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ফলে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে চরম বিপর্যয় নেমে আসে।
কেনো এত বৃষ্টিপাত
আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই মূলত এই সময়ে এত বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো: বজলুর রশীদ নয়া দিগন্তকে বলছিলেন, ‘প্রাক-বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে হাওরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি একটি নতুন প্রবণতা। জলবায়ু পরিবর্তনেরই বিরূপ প্রভাব এটি।’
বিপর্যয়ের বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জসহ হওয়ার অধ্যুষিত সাত জেলায় এবার ব্যাপক ফসলহানি হয়। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায় থেকে বৃষ্টি ও বন্যার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য আসতে শুরু করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, কিশোরগঞ্জসহ হাওরের সাত জেলায় চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ হয়েছিল চার লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে এপ্রিলের বৃষ্টিতে ও উজানের পানির ঢলে প্রায় এক লাখ হাজার হেক্টরের বেশি বোরো জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে তারা কিছুটা রক্ষণশীল হচ্ছেন বলে এ প্রতিনিধিকে জানান।
দৈনিক নয়া দিগন্তের মাসিক প্রকাশনা ‘অন্য এক দিগন্ত’র কিশোরগঞ্জ ক্লাবের সদস্যরা গত ৩ এপ্রিল মাসিক সভায় ‘জলবায়ু পরিবর্তন : হাওরে সংকট’ শিরোনামে তাদের আলোচনার পরবর্তী মাসের বিষয় নির্ধারণ করেন। সভায় বলে দেয়া হয় বিষয়ের ওপর গবেষণা করতে। এর এক সপ্তাহ পরেই হাওরে শুরু হয় বিপর্যয়। বৈশ্বিক বিষয়ের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের স্থানীয় কারণ পর্যালোচনা করেন সদস্যরা। একমাস পড়াশোনা করে গতকাল শুক্রবার এ মাসের সভায় জলবায়ুর গবেষণার বিষয়টি তারা উপস্থাপন করেন।
সভায় ক্লাব সদস্য ও গুরুদয়াল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নাসাঈদ রহমতুল্লাহ তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘হাওরের তলদেশ, নদী-নালা পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়াও হাওরে উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত উচ্চ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এতে পানিনিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। হাওরকে হাওরের মতো থাকতে দেয়া হয়নি। যার ফলে এর প্রভাব পড়েছে পরিবেশে।’
করিমগঞ্জ কলেজের শিক্ষার্থী নাফিউল ইসলাম বলেন, ‘অসময়ে হাওরে অতিবৃষ্টির অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক ভৌগোলিক অবস্থা এবং মানব-সৃষ্ট পরিবেশগত পরিবর্তন।’
ক্লাবের সদস্য ও কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া জামান সাইকী বলেন, ‘এই বিপর্যয় আমরা নিজেরাই এনেছি। হাওরে এক সময় প্রচুর পরিমাণে হিজল গাছ, বরুণ গাছসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদের অধিক্য ছিল। হাওরে এখন গাছ চোখে পড়ে না। অন্যদিকে হাওরের ফসল রক্ষার নামে প্রতিবছর বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হয়। এতে শতকোটি টাকা ব্যয় হয় প্রতিবছর। অপরিকল্পিত প্রকল্পে হাওর উলটপালট করে দেয়া হচ্ছে। প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব এটাও একটা কারণ।’
ক্লাবের সদস্য জান্নাতুল নুরেন মত দেন, হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে অতি বৃষ্টির আশঙ্কা এখন প্রবল, এবছরই যে এটার শেষ, তা নয়। তাৎক্ষণিক আবহাওয়ার খবর জানার জন্য হাওরে সরকারিভাবে ঘন রাডার নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রয়োজন বা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের অতি উচ্চ-রেজোল্যুশনযুক্ত মডেল স্থাপন যা ছোট মাত্রার ঘটনাকেও ক্যাপচার করতে পারে। এটা এই কারণে প্রয়োজন হাওরের কৃষকদের যেন বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়ে আগেই ধান ঘরে তুলতে পারে।’
গুরুদয়াল কলেজের শিক্ষার্থী সাদিক আহমেদ আমির বলেন, ‘এখন যে পরিস্থিতি, তাতে হাওরে প্রচলিত কৃষি এবং চিরাচরিত ফসল নির্বাচনে পরিবর্তন আনতে হবে। স্বল্প সময়ের বোরো ধান চাষ করতে হবে।’
ক্লাবের সদস্য তাসিন আহমেদ তৌকির মত দেন, ‘পরিবর্তিত অবস্থায় এই কৃষি এবং ফসল কেমন হবে তা গবেষক, কৃষিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঠিক করতে হবে। হাওর অর্থনীতিকে কেবল কৃষি নয়, অকৃষি খাতের ওপরও জোর দিতে হবে।’
গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় শহরের গুরুদয়াল সরকারি কলেজের মুক্তমঞ্চে ‘অন্য এক দিগন্ত ক্লাব’ এর মাসিক এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা সঞ্চালনা করেন ক্লাবের সদস্য সচিব ও আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। এতে সভাপতিত্ব করেন ক্লাবের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঈশাখাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর বদরুল হুদা সোহেল।



