গৌরনদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নোংরা পরিবেশ ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য

হাসপাতালের ভেতরে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়গানিষ্টিক সেন্টারের দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম। চিকিৎসকের রুম থেকে কোনো রোগী বের হওয়ার সাথে সাথে টানাটানি শুরু হয়ে যায়।

জহুরুল ইসলাম জহির, গৌরনদী (বরিশাল)

Location :

Gaurnadi
গৌরনদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নোংরা পরিবেশ ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য
গৌরনদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নোংরা পরিবেশ ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য |নয়া দিগন্ত

বরিশালের গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সঙ্কট, চিকিৎসা সেবার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকা, নোংরা পরিবেশ, প্যাথলজি দালাল ও মেডিসিন কোম্পানীর প্রতিনিধিদের দৌরাত্মসহ নানাবিধ সমস্যার কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে একাধিক চিকিৎসক জানান, সদ্য যোগদানকৃত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফকরুল ইসলাম মৃধা যোগদান করার পরে এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

সরেজমিনে স্থানীয় লোকজন, সেবা নিতে আসা রোগী, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরিশালের গৌরনদী উপজেলার প্রায় দুই লক্ষাধিক জনগোষ্ঠির স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে ১৯৭৪ সালে একটি ভবন নির্মাণ করে গৌরনদী সদরে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তিকালে ২০১০ সালে তা সম্প্রসারিত করে ৫০ শয্যার উন্নীত করা হয়। ভৌগলিক কারণে গৌরনদী উপজেলার মানুষ ছাড়াও পাশের আগৈলঝাড়া, উজিরপুর, বাবুগঞ্জ, মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষসহ তিন লক্ষাধিক মানুষ গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা নিয়ে থাকে। চিকিৎসক সঙ্কটে মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৬ চিকিৎসক ও জুনিয়র কনসালটেন্ড থাকার কথা রয়েছে। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক মারাত্মক চিকিৎসক সঙ্কট রয়েছে। জুনিয়র কনসালটেন্ড মেডিসিন, জুনিয়র কনসালটেন্ড সার্জরি, জুনিয়র কনসালটেন্ড শিশু, জুনিয়র কনসালটেন্ডইএনটি, জুনিয়র কনসালটেন্ড অবথালমোলজি, জুনিয়র কনসালটেন্ড অর্থপেটিক, জুনিয়র কনসালটেন্ডচর্ম-যৌন, জুনিয়র কনসালটেন্ড কাডিওলজি, জুনিয়র কনসালটেন্ড এনেসথিওলজি ও মেডিক্যাল অফিসার ইউনানি পদ দীর্ঘদিন যাবত শূন্য রয়েছে। এসব পদ শূন্য থাকায় স্বাস্থ্য সেবা ভেঙ্গে পড়েছে।

এছাড়া গৌরনদী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য কেন্দ্রর মধ্যে খাঞ্জাপুর, বার্থী, চাঁদশী, বাটাজোর ও নলচিড়া ইউনিয়ন বিগত কয়েক বছর যাবত কোনো চিকিৎসক নাই।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক সূত্র জানান, গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোকবল সঙ্কট ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকা ও চিকিৎসা সেবার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকাসহ নানাবিধ কারণে স্বাস্থ্য সেবা মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে।

বিষয়টি বারবার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেন্ট্রাল অটোমেশন শুরু করা হয়েছিল কিন্তু তাও বন্ধ হয়ে গেছে। ভৌত অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও মেডিক্যাল অফিসাররা কোয়ার্টারে থাকতে পারেন না। ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় তা বসবাস অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফকরুল ইসলাম মৃধা বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হচ্ছে হাসপাতাল ভবনের। হাসপাতাল স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কোয়ার্টার, মেডিক্যাল অফিসারদের কোয়ার্টার, মিলনায়তনসহ কর্মচারী কোয়ার্টার পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পরেও কোনো জায়গা না থাকায় পরিত্যক্ত ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হয়। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিত্যক্ত মিলনায়তনে সভা সেমিনার করতে হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী সঙ্কটের কারণে হাসপাতালের পরিবেশ প্রায়ই নোংরা থাকে। পাঁচজন পরিচ্ছন্ন কর্মী স্থলে রয়েছে একজন। একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী দিয়ে গোটা কমপ্লেক্সে সামলানো কষ্টকর। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে বিষয়গুলো সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের ভেতরে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়গানিষ্টিক সেন্টারের দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম। চিকিৎসকের রুম থেকে কোনো রোগী বের হওয়ার সাথে সাথে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। হাসপাতালে ওয়ার্ড ও শৌচাগারের অবস্থা খুবই অস্বাস্থ্যকর। দোতালায় উঠতেই শিড়ির পাশে রয়েছে শৌচাগার সেখানের পরিবেশ খুবই নোংরা হওয়ার কারণে দুর্গন্ধে ঢোকা কঠিন। উপরে গিয়ে ভর্তি রোগীর ব্যবহারের জন্য বাথরুমটি নোংরার কারণে তা ব্যবহার অনুপোযোগী।

এ সময় ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনরা জানায়, বাথরুমগুলোর পরিবেশ নোংরা হওয়ার কারণে বেডে থাকা খুবই কষ্টকর।

স্থানীয়রা জানায়, ভৌগলিক কারণে গৌরনদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পাশের বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, আগৈলঝাড়ার ও মাদারীপুরের কালকিনির মধ্যবর্তী স্থানে হওয়ার কারণে এখানে আউটডোরে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ রোগী সেবা নিতে আসেন কিন্তু চিকিৎসক সঙ্কটের কারণে মাঝে মাঝে সেবা না নিয়ে চলে যেতে হয়।

আউটডোরে সেবা নিতে আসা রোগী মোতালেব হোসেন (৫০), আলিমন বিবি (৬০)-সহ অনেকেই বলেন, হাসপতালে ডাক্তার এতই কম যে সেবা নিতে দিন পার করতে হয়।

ভর্তি রোগী আলী সরদারের অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি পাঁচ দিন, এর মধ্যে আমাকে খাবার দিছে দু’দিন। তাও খুবই নিম্নমানের খাবার।

শহিদুল ইসলাম বলেন, তিন দিন ভর্তি হয়েছি আমাকে খাবার দেয়া হয় না।

এ প্রসঙ্গে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো: ফকরুল ইসলাম মৃধা বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়গানিষ্ট সেন্টারও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সকাল ৯টার পরে হাসপাতালে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। খাবার মান নিয়ে আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বরিশাল সিভিল সার্জন ডা. এস. এম. মনজুর এ এলাহী বলেন, কিছু কিছু সমস্যা রয়েছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।