ফরিদপুর জিলা স্কুলে ব্যান্ড শিল্পী জেমসের নগর বাউলের কনসার্টে প্রবেশ করতে না পেরে বহিরাগতদের সাথে চরম হট্টগোল হয়েছে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীদের। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শান্তিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় নগর বাউলের কনসার্ট অনুষ্ঠানটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) রাত সোয়া ৯টার দিকে নগর বাউলের কনসার্ট দেখতে স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া বহিরাগতদের সাথে এ ঘটনা ঘটে। এসময় প্রায় এক ঘণ্টা স্কুলের সামনের প্রধান সড়কে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, চেয়ার ভাংচুর ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও কনসার্ট দেখতে না পারায় পরে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে ফিরে যায় শিক্ষার্থীরা।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তি উদযাপন ও পুনর্মিলনী’২৫ উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়। শেষ দিনে কনসার্ট অনুষ্ঠানের আগে পুরস্কার বিতরণের সময় রাত সোয়া ৯টার দিকে প্রথম হট্টগোল বাঁধে।
প্রত্যক্ষদর্শী রুবেল নামে এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘কনসার্ট শুরুর আগে পুরস্কার বিতরণের সময় তিনটি ছেলে দেয়াল টপকে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে। তবে উঁচু দেয়াল টপকে নামার সময় তারা ভিতরে পড়ে গেলে তাদের মারপিট করা হয়। এসময় বাইরে অপেক্ষারত বিপুল সংখ্যক বহিরাগতের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দু’পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-ধাওয়ি চলে বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে। আর সেখানে সমবেত উভয় পক্ষের তরুণ-যুবকদের মধ্যকার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।’
এসময় হুড়োহুড়ি ও ইটের আঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনাস্থলে কনসার্ট অনুষ্ঠানে দর্শক সারির কয়েকটি জায়গায় চেয়ারও ভেঙেচুরে যায়।
প্রায় আধাঘণ্টা এ অবস্থা চলার সময় মঞ্চ থেকে সকলকে নিবৃত্ত হওয়ার পরামর্শ দেন আয়োজক পরিষদ। পুনর্মিলনী আয়োজক পরিষদের সভাপতি ডা: মোস্তাফিজুর রহমান শামীম এসময় এ হামলার জন্য দুর্বৃত্তদের দায়ী করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলায় জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের বীর হিসেবে আখ্যায়িত করে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমাদের অনেক ছাত্র ভাই আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে রেখে আমরা গান শুনতে পারি না। তাই আমরা আমাদের কনসার্ট অনুষ্ঠান স্থগিত করলাম।’
এসময় মঞ্চের সামনে দর্শক সারিতে ক্লাস ফোর-ফাইভের ছাত্রদেরও অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তিনি তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সকলকে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
আয়োজক পরিষদের সদস্য সচিব মো: ওয়াহিদু মিয়া কুটি বলেন, ‘আমরা আবার কনসার্টের আয়োজন করবো। প্রয়োজনে জেমসকে আবার এনে গান গাওয়াবো। কিন্তু আজকে আর আমরা কনসার্টের ব্যবস্থা করতে পারছি না। শিগগিরই আমরা পরবর্তী একটি দিনে এই কনসার্ট আয়োজনের তারিখ জানাবো।’
এদিকে, ফরিদপুর জিলা স্কুলের কনসার্ট ঘিরে হট্টগোলের খবর পেয়ে রাত পৌনে ১০টার দিকে সেখানে উপস্থিত হন ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী চৌধুরী নায়াব ইউসুফ। তিনি এমন একটি সুন্দর আয়োজন এভাবে পণ্ড হয়ে যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন। এছাড়া বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের চিহ্নিত করা হবে বলেও আশ্বাস দেন।
আয়োজক পরিষদের সদস্য বেনজির আহমেদ তাবরীজ বলেন, আমরা এই অনুষ্ঠান সফল করার সাথে জড়িত সকলকে ধন্যবাদ জানাই। প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই। তারাও আমাদের অনেক সহায়তা করেছেন। কিন্তু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে আজ আমরা সুন্দরভাবে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারিনি। এজন্য আমরা সকলের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, ‘বহিরাগত দর্শকদের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা স্কুলের সামনে বাইরে বড় মনিটরে অনুষ্ঠান উপভোগ করার ব্যবস্থা রেখেছিলাম। তারপরেও দুর্বৃত্ত চক্র এভাবে হামলা চালিয়ে আমাদের আবেগের ওপরে হামলা চালালো। এ ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।’
এদিকে, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আহতদের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি। হট্টগোল থামাতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ চালায়। অন্যদিকে, কনসার্ট অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যাওয়ায় উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের অনেকে স্কুলের সামনের সড়কে একত্রিত হয়ে দীর্ঘক্ষণ যাবত হামলাকারীদের খুঁজতে দল বেঁধে অভিযান চালায়। পুরো এলাকায় এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বর্ষপূর্তি ও পুনর্মিলনী’২৫ উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে বুধবার উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠান শুরু হয়। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সকাল ১০টায় জিলা স্কুল চত্বরে কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান মোল্যা। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফরিদপুর জিলা স্কুল ১৮৪০ সালে ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এডগার এফ. লুথার কর্তৃক ইংলিশ সেমিনারটি স্কুল নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ সরকার এর দায়িত্ব নেয়ার পর এর নাম পরিবর্তন করে ফরিদপুর জিলা স্কুল রাখা হয়।



