মুন্সীগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে পৌষের কনকনে শীত নামলেই শুরু হয় নকশিকাঁথা সেলাইয়ের ব্যস্ততা। আধুনিক কম্বল ও লেপের ভিড়ের মধ্যেও পুরোনো কাপড় ও রঙিন সুঁই-সুতায় গ্রামীণ নারীরা শতাব্দীর প্রাচীন এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
জেলার সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, দিনের কাজ শেষে উঠান বা খোলা আঙিনায় বসে গৃহবধূ, কলেজশিক্ষার্থী তরুণী ও বয়স্ক নারীরা কাঁথা সেলাই করছেন। মা, খালা ও শাশুড়িদের কাছ থেকে শেখা এ সূচিশিল্প মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের নারীদের হাতেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে টিকে আছে।
নকশিকাঁথা শুধু গ্রামীণ জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ নয়, এটি বহন করে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস। ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব কয়েক হাজার বছর আগে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা থেকে শুরু করে প্রাচীন মিশর ও গ্রিসের নিদর্শনে সূচিশিল্পের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হিসেবেই বাংলার গ্রামাঞ্চলে নকশিকাঁথা আজও প্রচলিত।
বর্তমানে এ শিল্প কেবল ঘরোয়া ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নেই। শীত মৌসুমকে কেন্দ্র করে নকশিকাঁথা গ্রামীণ নারীদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে।
শম্পা রানী পাল নামে এক গৃহবধূ বলেন, ‘ঘরে বসে কাঁথা সেলাই করে সংসারের বাড়তি খরচ মেটানো যাচ্ছে।’
নারী উদ্যোক্তা শ্রাবণী আক্তার বিথী জানান, একটি নকশিকাঁথা তৈরি করতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা ব্যয়ে তৈরি এসব কাঁথা মান অনুযায়ী ৯০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় গৃহবধূ চম্পা বলেন, ‘সরকারি সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা গেলে এই শিল্প আরো বিস্তৃত করা সম্ভব।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুর মহল আশরাফী বলেন, ‘নারীদের কর্মসংস্থান ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণে সরকার কাজ করছে। নকশিকাঁথাসহ গ্রামীণ সূচিশিল্পের সাথে জড়িত নারীদের পাশে জেলা প্রশাসন আগামীতেও থাকবে।’
শীতের সকালে মুন্সীগঞ্জের গ্রাম বাংলায় যখন সুঁই-সুতার ফোঁড়ে কাঁথা তৈরি হয়, তখন তা শুধু শীত নিবারণের উপকরণ নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।



