প্রায় একযুগ ধরে দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে লালমনিরহাট রেল স্টেশনের ‘নদী ভাঙ্গা পরিষদ’। কিছু মানবদরদী ব্যক্তির মহৎ এ উদ্যোগ এলাকায় বেশ প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় একটি ব্যস্ততম স্টেশন লালমনিরহাট। বৃটিশ শাসনামলে এখানে গড়ে উঠে রেলওয়ে উপনিবেশ। রেলওয়ে প্লাটফর্ম, জংশন, ওভার ব্রিজকে ঘিরে এখানে প্রতিদিন আশ্রয় নেয়া অসহায়, নদী ভাঙ্গা, বাস্তহারা, ছিন্নমূল, দরিদ্র ও ঠিকানাহীন দুই শ থেকে তিন শ’ মানুষ। এসব মানুষের অনাহারে-অর্ধাহারে স্টেশনে রাত্রি যাপন করেন। সকাল হলে আবার বেরিয়ে পড়েন জীবন সংগ্রাম নামক কাজের খোঁজে। ওইসব ছিন্নমুল মানুষের ভালবাসায় স্টেশন এলাকার কিছু মানবদরদী ব্যক্তির সহযোগীতায় ২০১২ সালে লালমনিরহাট প্লার্টফম এলাকা ঘিরে গড়ে উঠে সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নদী ভাঙ্গা পরিষদ’।
নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো ছিন্নমূল, দরিদ্র এবং শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী মানুষ প্রতি বৃহস্পতিবার রাতের অপেক্ষায় থাকেন। কারণ, এই রাতে লালমনিরহাট শহরের রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ‘নদী ভাঙ্গা পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন দুস্থ মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার (বিশেষ করে খিচুড়ি) বিতরণ করে। লালমনিরহাট রেলস্টেশন এলাকায় থাকা কোনো ছিন্নমূল মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে, তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা এবং মারা গেলে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করার দায়িত্বও পালন করে নদী ভাঙ্গা পরিষদ। প্রায় এক যুগ ধরে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি। প্রতি বৃহস্পতিবার ৩৫ থেকে ৪০ কেজি চালের সবজি খিচুড়ি এবং মাসে অন্তত একবার মুরগি বা খাসির মাংস দিয়ে বিরিয়ানি বা খিচুড়ি রান্না করে বিতরণ করা হয়।
নদী ভাঙ্গা পরিষদের সভাপতি শামীম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান এবং প্রচার সম্পাদক ফজলুল হক জানিয়েছেন, তাদের নিজস্ব কোনো তহবিল নেই। আগ্রহী বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন থেকে অর্থ ও খাদ্য উপকরণ সংগ্রহ করেন তারা। এরপর সংগঠনের সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে খিচুড়ি রান্না করেন যা প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে বিতরণ করা হয়। শহরের অনেক বাসা থেকে নারীরা মুষ্টির চাল দিয়ে যান, বাগানের শাকসবজি দিয়ে যান। শহরের গোশলা বাজারের সবজি ব্যবসায়ীরাও কখনো কখনো সবজি দিয়ে যান।
তারা আরো জানিয়েছেন, লালমনিরহাট জেলার প্রধান তিনটি নদী তিস্তা, ধরলা ও রতনাইয়ের ভাঙনের শিকার হয়ে অনেক মানুষ বাস্তচ্যুত হয়েছেন। তাদের অনেকে রেলস্টেশন, বাস স্টেশন, রিকশাস্ট্যান্ডে বা শহরের কলোনি ও দোকানের বারান্দায় রাত কাটান। বয়সের কারণে অনেকে কাজ করতে পারেন না। পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরা অনেক প্রবীণের খোঁজ নেন না। অনেকে আবার শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। এমন অসহায় মানুষদের কথা ভেবে তারা এই সংগঠন করেছেন।
শহরের রেলওয়ে বাবু পাড়ার পরিত্যক্ত বাসায় থাকেন ভ্যান চালক রফিকুল ইসলাম (৬০) এখন কাজকর্ম করার শক্তি নেই শরীরে।
রফিকুল বলেন, এখন রিকশা চালাইতে পারি না। কয়েক বছর থাইকা বিষুধবার (বৃহস্পতিবার) রাইতে (রাতে) স্টেশনে যাই। সপ্তায় অন্তত একটা দিন পেট ভইরা খাইতে পারি। আমার মতো অনেক অসহায় একবেলা পেটভরে খেতে পেরে খুবেই খুশি।
এ বিষয়ে নদী ভাঙ্গা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকার দুই শ’ থেকে তিন শ’ দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে লালমনিরহাট রেলস্টেশন এলাকায় আসেন।
সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকেরা তাদের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করেন। তিনি আরো বলেন, ‘নদী ভাঙ্গা পরিষদ তাদের এ মহতী উদ্যোগের জন্য যথেষ্ট ‘প্রশংসিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে।



