দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ মানুষ বছরে একটিমাত্র বোরো ফসলের উপর নির্ভরশীল। সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফলানো বোরো ধান অতিবৃষ্টির কারণে চোখের সামনেই ডুবে যাচ্ছে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে হাওরে ও নদীতে দ্রুত পানি বাড়ায় চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের পাকা-আধা পাকা ধান। এ কারণে হাওর জুড়ে কান্না রোল পড়েছে।
সুনামগঞ্জের সবকয়টি হাওরে উৎপাদিত ধান, দেশের অর্থনৈতিক শক্তি যুগিয়েও যে ধান খাদ্য চাহিদা পূরণ করে সেই ধানিজমি (নীচু জমি) এখন বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। বছরে একটিমাত্র বোরো ফসলকে ঘিরেই হাওরবাসীর যত স্বপ্ন। ফসল ঘরে উঠলে আনন্দে কাটে সারা বছর। ফসলের ক্ষতি হলে বুকে চাপা কান্না নিয়ে বাড়ি ছেড়ে কাজের সন্ধানে ছুঠতে হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে।
সুনামগঞ্জের এই বোরো ধান ঠিক মতো ঘরে উঠলে দেশের অর্থনৈতিক খাতে অবদান রেখে খাদ্য চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।
সুনামগঞ্জে চলতি বছর ‘২ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে’। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ হেক্টর জমি প্রথমেই শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার শস্যভাণ্ডার খ্যাত দেখার হাওর, চলতি বছর হাওরপাড়ের কৃষকরা বোরো ধান নিয়ে প্রথমেই বাঁধ বেড়িবাঁধ পরে অতিবৃষ্টি তাদের কাল হয়ে দাড়িয়েছে। বৈশাখ মাস আসতে না আসতেই শুরু হয়েছে অতিবৃষ্টি। আর এই বৃষ্টিতে ফসলি মাঠে জলাবদ্ধতায় ধীরের ধীরে ডুবছে কৃষকদের স্বপ্নের পাকা ধান। চৈত্রের শেষ সপ্তাহে প্রথম দফায় শিলাবৃষ্টিতেও কিছু ক্ষতি হয়েছে বোরো ক্ষেত। এরপরই ভারি বৃষ্টিতে শুরু হয় অকাল বন্যার শঙ্কা। প্রথমে জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা জমি উদ্ধারে সেচ পাম্প দিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করেন কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, এ বছর সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় মোট ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন। ফলনও হয়েছি ভালো হয়েছিল।
কৃষি বিভাগের দাবি, গত বুধবার পর্যন্ত ৫৬ ভাগ বোরো ধান কাটা হয়েছে। হাওরে এখনো অর্ধেক ধান জমিতে পড়ে আছে।
তবে কৃষকরা বলছেন ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ধান কর্তন করা হয়েছে। যেগুলো ধান কাটা ও মাড়াই হয়েছে সেগুলোর অর্ধেক শুকানোর অভাবে খলায় পড়ে আছে। রোদ না থাকায় কৃষকরা পড়েছেন আরো দুর্দশায়। ধানে চাড়া গজানোর উপক্রম শুরু হয়েছে।
জামালগঞ্জের পাকনা হাওরের কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী ছানা বলেন, বৃষ্টির কারণে ধান পাকতে কিছুটা দেরি হয়েছে। সারা বছর কষ্ট করেও এখনো এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারছি না। যে হাতে সারা জীবন মানুষকে ধান বিলিয়ে দান-খয়রাত করে এসেছি, সেই হাতে এখনো আমার গোলা ঘরে একটি ধানও ওঠেনি। আমার কাজের লোকের বেতন, সারা বছর সংসার চালানো বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কিভাবে চলবো এই দু:শ্চিন্তা রাত দিন কাটছে।
কৃষক রহিম আলী বলেন, কোনো উপায় না পেয়ে পাকা ও আধা পাকা ধান কাটছেন তারা। হাওরে জলাবদ্ধতা থাকায় অনেক স্থানে ধান কাটার কম্বাইন হারভেস্টার চালানো যাচ্ছে না। শ্রমিকও তেমন নেই। আবার এখনো সব হাওরে ধান পাকেনি। সঙ্কটে থাকায় হাওরের কৃষকরা অধিক মূল্য দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছেন না। এতে অনেক জমি পানির নিচেই পড়ে রয়েছে। কেউ কেউ একবারে জমিতে কোনো কাঁচি লাগাতে পারেননি। যেসব ধান সংগ্রহ করেছিলেন তাও মূল্য কম থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। বিক্রির আশায় হাওরে ধান রাখায় ধানে চাড়া গজাচ্ছে। হাওরের কৃষকদের সারা বছরের খোরাকি যোগানসহ সব কিছু মিলিয়ে হাওর অঞ্চলে এখন অসহায়ত্বের পরিবেশ বিরাজ করছে। মনে বন্যার ভয়, মাথায় বৃষ্টি বজ্রপাতের শঙ্কা আর দুর্ভোগ নিয়েই হাওরের কৃষকরা প্রানান্তকর চেষ্টা করছে ধান তুলতে।
এদিকে, মনাই নদীতে পানি প্রবেশ করে ইকরাছই হাওরের প্রায় ১১৪ হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। মধ্যনগর উপজেলার এরন বিলের ইকরাছই হাওরের বাঁধ ভেঙে যায়।
বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামসংলগ্ন মনাই নদীর তীরবর্তী বাঁধটি মূলত গ্রামীণ রাস্তা। এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাভুক্ত কোনো বাঁধ নয়। এই বাঁধটি ভেঙে এরন বিলের ইকরাছই হাওরটি তলিয়ে যায়। পাঁচ থেকে সাতটি গ্রামের হাজারো কৃষক এই হাওরে বোরো ধান আবাদ করেন।
মধ্যনগর কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এখানে ১২ হেক্টর বোরো জমির ক্ষতি হতে পারে।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে নদীর পানি বাড়ছে, বিভিন্ন উপজেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়েও শঙ্কিত আছে কৃষকরা। ভারতীয় পাহাড়ি ঢল হলে কোন কোন ফসল রক্ষা বাঁধ টিকবে কি না এমন দু:শ্চিন্তায় করছেন মানুষজন।
জামালগঞ্জ উপজেলার বৃহত্তর পাকনা হাওরসহ সবকয়টি হাওর মিলে এ উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টরের মতো ফসল তলিয়ে আছে। ফেনারবাঁক গ্রামের সামনে লম্বাবাঁক ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছে। ফেনাবরাঁক, শান্তিপুর, ইনাতনগর, লক্ষীপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষকরা প্রথমে স্বেচ্ছায় কাজ করেন, পড়ে বেসরকারি সেবা সংস্থা সিএনআরএস'র থেকেও এই লম্বাবাঁক কাজ করানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে কিছু জিও বস্তার ব্যাগ দেয়া হয়েছে। ইমার্জেন্সি অর্থনৈতিক সহায়তারও আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। লম্বাবাঁধ ডুবে গেলে তিনটি ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষক পরিবারে দুর্যোগ আর দু:খ দুর্দশা নেমে আসবে।
পাউবো এবার সুনামগঞ্জে হাওরের ফসল রক্ষায় ১৪৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, বুধবার পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে প্রায় ১ লাখ হেক্টর। চলমান অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয়েছে ৭ হাজার ৫০ হেক্টর। তবে কৃষদের দাবি আরো বেশী। হাওরে এখনো ১ লাখ হেক্টর জমিতে ধান রয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়া, শ্রমিক সঙ্কট, বজ্রপাতের ভয়ে এসব ধান কাটতে হিমসিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, প্রত্যেক উপজেলা প্রশাসন ও পাউবো, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি মিটিং করা হয়েছে। হাওরের ধান কিভাবে তোলা যায়। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপরও প্রকৃতির বৈরিতার উপর কারো হাত নেই। তবুও সবাই মিলে কৃষকরা যাতে তাদের ঘরে ধান ঘরে তুলতে পারেন আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকার এমপি কামরুজ্জামান কামরুল ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাওরের বাঁধ-বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে কৃষকদের পাশে থেকে ফসল রক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা জানান।



