ডালিয়া ব্যারেজের ৪৪ জলকপাট খুলে দিয়ে সামলানো হচ্ছে চাপ

এছাড়াও আগামী ২৪ ঘন্টায় ভারী ও অতিভারী বৃষ্টির তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে জনজীবন
পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে জনজীবন |নয়া দিগন্ত

ভারতের গাজলডোবা গেটের সবকটি গেট খুলে দেয়া এবং ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে উজানের পানি আছড়ে পড়েছে তিস্তার বাংলাদেশের ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়াও আগামী ২৪ ঘন্টায় ভারী ও অতিভারী বৃষ্টির তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ধরলা, ব্রক্ষপুত্রেরও একই অবস্থা। এরই মধ্যে তিস্তা অববাহিকার ১৫২ কিলোমিটার এবং ধরলা ও ব্রক্ষপুত্র এলাকার ৩৬০ কিলোমিটার এলাকার চরাঞ্চল ছাড়াও নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। হাজার হাজার হেক্টর জমির বাদাম, পাট ও সদ্য রোপিত আমন ধানের জমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। শতশত পুকুর তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাথে সমানতালে চলছে ভাঙ্গন। পানি বৃদ্ধি অব্যাগত থাকলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়বে এই অববাহিকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় লালমনিরহাটের দোয়ানীতে অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি ৫২ দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপরে (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার)। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও ব্যারেজ রক্ষায় ৪৪টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে।

এর আগে, গত মঙ্গলবার সকাল ৯টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় ২০০ দশমিক ০, রংপুর ২১ দশমিক ৪ এবং উজানে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের কোচ বিহার ১০ দশমিক ৫ ও আসামের গোয়াহাটিতে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

এছাড়াও আগামী ২৪ ঘন্টায় দেশের অভ্যন্তরে রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগসমূহে ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা আরো জানান, গজলডোবার সবগুলো গেট খুলে দেয়া এবং পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে উজানে ভয়াবহ রকম পানি বৃদ্ধি পায় পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এ কারণে ভাটিতে পাঁচ জেলার ১৪ উপজেলায় তিস্তা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে পানি উঠেছে। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনেশ্বরী, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, ইছামতি নদীর চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়ে যায়। দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন।

এছাড়া তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে চলে যাওয়ায় নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানের বাঁধে আঘাত করছে। ফলে বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব আরো জানান, এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২৪ ঘন্টায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতলে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এরই মধ্যে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এই সময়ে লালমনিরহাট, নীলফামারি, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার এসব নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহ প্লাবিত হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ এবং সরেজমিনে পাওয়া তথ্যে মতে, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারীর ডোমার, ডালিয়া, জলঢাকা, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, লালমনিরহাটের সদর, আদিতমারী, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ি, ভুরুঙ্গামারী, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলে পানি উঠছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, এমন পরিস্থিতিতে এই পাঁচ জেলার চরাঞ্চলের ২২৫টি গ্রামে বন্যার পানি ঢোকে ও প্রায় ২ লাখ মানুষ প্লাবিত হয়। ইতোমধ্যেই তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাড়ি-ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন মানুষজন। চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলগুলো থেকে মানুষজন বাড়ি-ঘর ছেড়ে গবাদিপশুসহ প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধে আশ্রয় নিচ্ছেন। অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চলে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলের রাস্তা, ব্রিজ ভেঙে চরসহ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে শতাধিক পুকুর ও মৎস খামারের মাছ। পানিবন্দি পরিবারগুলো ছোট শিশু, বৃদ্ধ ও গরু, ছাগল, হাস-মুরগী নিয়ে ভয়াবহ বিপাকে পড়েছেন। আত্মীয় স্বজনদের দেয়া ও শুকনো খাবারই একমাত্র ভরসা পানিবন্দিদের। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। টয়লেট করা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পানি বাড়া-কমার সাথে সাথে চলছে অববাহিকাগুলো জুড়ে ব্যাপক ভাঙ্গন। তিস্তা, ধরলাসহ এই অঞ্চলের অববাহিকাগুলোর অন্তত ১০৮টি পয়েন্টে দেখা দিয়েছে ছোট বড় ভাঙ্গন। অনেকস্থানে ভাঙ্গন ঠেকানোর কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পাউবো উত্তরাঞ্চলীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, যেসব স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সেখানে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, সরকারি স্থাপনা থাকলে গুরুত্ব দিয়ে সেসব স্থানে আপদকালীন কাজ করা হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সারাক্ষণ নদী পাড় মনিটরিং করছেন।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, এই অঞ্চলের তিস্তা পানি পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং অন্যান্য জেলাগুলোর নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধির আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা এবং প্রকল্প কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যেই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সকল প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যারা পানিবন্দি হয়ে পড়বেন তাদের দ্রুতগতিতে উঁচু স্থানে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়ার ব্যবস্থা করবেন তারা। পানিবন্দি মানুষের তাৎক্ষণিকভাবে খাবারও দেয়ার ব্যবস্থা করবেন তারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ি ঢল এবং ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিবে এই অঞ্চলে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত আছি।