চরফ্যাশনে হাজার হাজার টিউবওয়েলে উঠছে না পানি

বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে দেখা দিয়েছে খাবার পানির সঙ্কট। মসজিদে মসজিদে পানি না থাকার কারণে অযুতে বিঘ্ন ঘটছে। পুকুরের পানিতে ময়লা থাকায় ওই পানি ব্যবহারে দেখা দিয়েছে নানা রোগ। ডায়রিয়ার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু-কিশোররা।

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, চরফ্যাশন (ভোলা)

Location :

Bhola
পানি উঠছে না টিউবওয়েলে
পানি উঠছে না টিউবওয়েলে |নয়া দিগন্ত

ভোলার বৃহত্তর উপজেলা চরফ্যাশনে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। যার ফলে চরফ্যাশন পৌর শহরসহ ২১টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টিউবওয়েলে পানি উঠছে না।

ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে টিউবওয়েলগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে পুকুর, খাল ও ডোবা থেকে পানি সংগ্রহ করছেন বাসিন্দারা। এতে সুপেয় পানির সঙ্কটের ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের। আবার কিছু টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করা গেলেও তা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে গিয়ে আনতে হচ্ছে।

বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে দেখা দিয়েছে খাবার পানির সঙ্কট। মসজিদে মসজিদে পানি না থাকার কারণে অযুতে বিঘ্ন ঘটছে। পুকুরের পানিতে ময়লা থাকায় ওই পানি ব্যবহারে দেখা দিয়েছে নানা রোগ। ডায়রিয়ার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু-কিশোররা।

ভুক্তভোগীরা জানায়, বেশিসংখ্যক টিউবওয়েল স্থাপনের কারণে অধিকাংশ পুকুর ও খালে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে অকেজো হয়ে পড়েছে টিউবওয়েলগুলো। ফলে সুপেয় পানির সঙ্কট বেড়েছে। এছাড়া কৃষকরা বর্তমানে সাব-মার্সিবল পাম্প ব্যবহার করছে তাদের কৃষি কাজে। ফলে টিউবওয়েলে পানি না উঠার কারণ হতে পারে এসব পাম্প ব্যবহার করার কারণে।

চরফ্যাশন উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন পৌরসভাসহ ২১টি ইউনিয়নে সরকারি উদ্যোগে ১০ থেকে ১২ হাজারটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানায় উপজেলায় রয়েছে আরো লক্ষাধিক গভীর নলকূপ। এর মধ্যে নয় হাজার ৮৫১টি সচল ও সরকারি অর্থয়ানে নির্মিত প্রায় দুই হাজার ৫০০ নলকূপ অকেজো আছে।

এসবের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে এখানে ৪০ হাজারের বেশী নলকূপের পানি উঠছে না। সরকারি বে-সরকারি মিলিয়ে প্রায় অর্ধলক্ষ গভীর নলকূপে মিলছে না পানি।

চেয়ারম্যান বাজারের পল্লী চিকিৎসক মো: জাকির হোসেন ফিরোজ বলেন, ‘গতকাল চেয়ারম্যান বাজার জামে মসজিদের সাপ্লাইতে পানি ছিল না, তাই অজু করতে না পেরে অনেক মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেননি।’

চরফ্যাশন পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা চরফ্যাশন বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. হানিফ বলেন, ‘আমাদের বাড়ির নলকূপে ঠিকমত পানি উঠছে না। সুপেয় পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে চরমভাবে। মানবিক চিন্তা কারো নেই। হয় খাল খনন করে মিষ্টি পানির ব্যবস্থা করা উচিত, নতুবা গভীর নলকূপ বন্ধ করা উচিত।’

চরমানিকা ইউনিয়নের বাসিন্দা দক্ষিণ আইচা বাজারের আইচা মেডিক্যাল হলের মালিক সাইফুল হাওলাদার বলেন, ‘ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে ইরি তরমুজ করে এই জন্য নলকূপের পানি সমস্যা হচ্ছে।’

চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের বাসিন্দা মো: জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘চরফ্যাশন উপজেলাধীন চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত নলকূপের কারণে টিউবলে পানি উঠে না।’

সমস্যা সমাধানে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার দাবি জানান তিনি।

জাহানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ‘দীর্ঘ ৩০ বছর টিউবওয়েল থেকে পানি ব্যবহার করে আসছি। প্রায় তিন মাস আগ থেকে টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। পুরো এলাকাতে মাত্র কয়েকটি টিউবওয়েল থেকে এখনো পানি উঠছে।’

জাহানপুর ইউনিয়নের ইরি বোরো গভীর নলকূপ প্রজেক্টের মালিক শাজাহান বলেন, ‘কৃষি আবাদের স্বার্থে আমরা নলকূপ বসিয়েছি। নলকূপের জন্য কৃষদের ভালো হয়েছে এবং আমাদের ইরি বোরো ভালো আসা করা যাচ্ছে। এই শুষ্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলে (গভীর নলকূপ) পানি উঠছে না।’

চরফ্যাশন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে এখানে শুষ্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। ফলে গভীর নলকূপগুলোতে শুষ্কমৌসুমে পানি উঠছে না। প্রতিবছর পানির স্তর দুই ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে। পাশাপাশি মানবসৃষ্ট (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সেচ কাজে ব্যবহার করা নলকূপের কারণেও পানির স্তর নিচে নেমেছে। গত বছরের চেয়ে এই সঙ্কট প্রবল আকার ধারন করবে। বিশেষ করে পৌর সদরের বেশীরভাগ বাসা-বাড়িতে ব্যবহৃত গভীর নলকূপ এবং সংযুক্ত মর্টারগুলোতে পানি উঠছে না। অপরিকল্পিতভাবে খাল-পুকুর-জলাশয় ভরাট করার ফলে এমন সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষামৌসুম আসার পর্যন্ত এ সঙ্কট চলমান থাকবে।’

উপজেলা স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নলকূপগুলোতে পানি না উঠায় গোটা উপজেলাব্যাপী বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফলে নিন্ম আয়ের মানুষ পুকুর জলাশয়ের জমাট পানি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। এতে করে শুষ্কমৌসুমে ডায়েরিয়া-আমাশয়ের মতো পানি বাহিত রোগ মহামারী আকারে ছড়াতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: লোকমান হোসেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বিভাগের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন চরফ্যাশন উপজেলা সহকারী আরিফ হোসেন বলেন, ‘টিউবওয়েলের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারনে এ সমস্যা হচ্ছে।’