চিকিৎসা অবহেলায় গুলিবিদ্ধ পা হারাতে বসেছেন জুলাই যোদ্ধা আজিম

৪ আগষ্ট ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে দুপুরে আন্দোলনকারীদের সাথে সড়কে জোহরের নামাজ আদায় করতে থাকেন। এ সময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা নামাজরত আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে হাতবোমা নিক্ষেপসহ সরাসরি গুলি করতে থাকেন। এতে আজিম বাম পায়ের গোড়ালিতে গুলিবিদ্ধ হন।

নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) সংবাদদাতা

Location :

Nangalkot
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ আনোয়ারুল আজিম
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ আনোয়ারুল আজিম |নয়া দিগন্ত

জুলাই যোদ্ধা আনোয়ারুল আজিম (২০) ফেনী সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। ফ্যাসিস্ট, পলাতক ও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাসিনার বিরুদ্ধে আজিম ২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গুলিতে ফেনীর মহিপালে গুলিবিদ্ধ হন।

গুলিতে তার পায়ের গোড়ালির লিগামেন্ট ও হাঁড় ফেটে যায়। গুলিবিদ্ধ বাম পায়ের গোড়ালির চিকিৎসা অবহেলায় এখন তিনি তার বাম পা হারাতে বসেছেন। তার বাম পা ধীরে-ধীরে চিকন হয়ে যাচ্ছে। পায়ের শক্তি নেই। হাঁটা-চলা করতে কষ্ট হয়। খুঁড়িয়ে-খুঁড়িতে হাঁটেন। বসলে এবং বিছানায় শুতে গেলেও পায়ে ব্যাথা করে। পা ঘুরোনো যায় না। পায়ের মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

জুলাই আন্দোলন শেষ হওয়ার দীর্ঘ দুই বছরেও গুলিবিদ্ধ পায়ের তীব্র যন্ত্রণা ও পা হারোনোর আশঙ্কায় আজিমকে প্রতিনিয়ত দিন কাটাতে হচ্ছে। তার সহপাঠিরা ডিপ্লোমা পাস করে চাকরি করলেও আজিমকে ডিপ্লেমা পাস করে শিক্ষিত বেকার হিসেবে কর্মহীন ও অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। দরিদ্র বাবার পক্ষে তার চিকিৎসার ব্যয়ভার ও পরিবারের ভরণপোষণ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আজিম জানান, কোনো চাওয়া-পাওয়ার জন্য আমি জুলাই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। কিন্তু আজকে পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমি কর্মক্ষম হয়ে যাচ্ছি।

আজিম কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা পূর্ব ইউনিয়নের নারায়নকোট গ্রামের আবদুল হাইয়ের একমাত্র ছেলে। আজিমের বাবা আবদুল হাই বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমার ছেলে আহত হয়েছে। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার ছেলের পুনরায় সু-চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

ঢাকার পিজি হাসপাতালে আজিমের গুলিবিদ্ধ পায়ের দীর্ঘ ১৩ মাস চিকিৎসা করা হলেও পায়ের কোনো উন্নতি হয়নি। পরে সাবেক পিজি ও বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে গিয়ে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তাদের হয়রানি ও অবহেলার শিকার হলেও তার পায়ের অপারেশন করাতে সক্ষম হন।

কিন্তু তার পেছনে অনেক টাকা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে, এই অজুহাতে সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অপারেশন-পরবর্তী ১২ সপ্তাহের থেরাপির মধ্যে মাত্র দুই সপ্তাহের থেরাপি দিয়ে তাকে না জানিয়ে আগে থেকে বিমানের টিকিট কেটে জোরপূর্বক দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেশে এসেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে থেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা না পেয়ে তার গুলিবিদ্ধ বাম পা সম্পূর্ণ অকেজো হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানান আজিম।

Comilla-July-Fighter-Leg

এদিকে, আজিম ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে তার পাসপোর্ট, ভিসাসহ আনুসাঙ্গিক কাজে অনেক টাকা ব্যয় হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তাকে পাসপোর্ট, ভিসাসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় নিয়ে তাকে ভাউচার জমা দিতে বলা হয়। আজিম এ পর্যন্ত কয়েকবার ভাউচার জমা দিলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অবহেলায় গত এক বছরেও তার ব্যয়ের জন্য বরাদ্ধকৃত ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারেননি।

আনোয়ারুল আজিম আরো জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ফেনী শহরের রেলগেট এলাকায় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পরে ফেনী শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতেন তিনি।

আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্যায়ে ৪ আগষ্ট ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে আন্দোলনের জন্য অন্যদের সাথে জড়ো হন। একপর্যায়ে দুপুরে আন্দোলনকারীদের সাথে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কে জোহরের নামাজ আদায় করতে থাকেন। এ সময় ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা নামাজরত আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে হাতবোমা নিক্ষেপসহ সরাসরি গুলি করতে থাকেন।

একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। এ সময় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গুলিতে ১১ জন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা নিহত হয় এবং তিনিসহ পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হন।

আজিম বাম পায়ের গোড়ালিতে গুলিবিদ্ধ হন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ছাত্রলীগ ক্যাডাররা তান্ডব চালায়। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে ফেনী সদর হাসপাতাল ও ডায়াবেটিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। আজিম ফেনী সদর হাসপাতালে আট দিন চিকিৎসা নেন। কিন্তু কোনো উন্নতি না হওয়ায় তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালে রেফার্ড করা হয়।

সেখানে তার কোনো উন্নতি না হওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের সহযোগিতায় তাকে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করেন। পিজি হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে প্রতিদিন ৩৫-৪০টি ওষুধ সেবন করাতেন। পিজি হাসপাতালে দীর্ঘ ১৩ মাস চিকিৎসায় তার পায়ের কোনো উন্নতি না হওয়ায় মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আজিম জানান, সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর থেকে তার হয়রানি শুরু হয়। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির একজন অফিস সহকারী এসে এয়ারপোর্ট থেকে তাকে নিয়ে ফিলিপস হোটেলের একটি ছোট কক্ষে নিয়ে রাখেন। পরদিন অ্যাম্বাসির ওই অফিস সহকারী তাকে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু অনলাইনে টিকেট কেটে চিকিৎসক দেখাতে দেরি হওয়ায় অ্যাম্বাসির অফিস সহকারী তাকে রেখে চলে আসে।

পরে সে নিজে চিকিৎসকের সাথে দেখা করেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক বাংলাদেশের পিজি হাসপাতালের রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন দেখে রোগ অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়নি বলে জানান। একপর্যায়ে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা নতুন করে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ধাপে-ধাপে তার চিকিৎসা শুরু করেন।

কিন্তু অ্যাম্বাসির লোকজন তার চিকিৎসার দিকে প্রাধান্য না দিয়ে তারা তার পেছনে অনেক টাকা ব্যয়ের হিসাব করেন এবং আজিমের সাথে প্রতিনিয়ত খারাপ আচরণ করেন। পরে চিকিৎকরা তাকে প্রথমে মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। এতে পায়ের উন্নতি না হওয়ায় থেরাপি শুরু করেন। থেরাপিতেও উন্নতি না হওয়ায় ইনজেকশন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। এতেও উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা তার পায়ের অপারেশন করেন।

অপারেশনের আট সপ্তাহ পর তার পায়ের প্লাস্টার খোলা হয়। প্লাস্টার খোলার পর চিকিৎকরা তার পায়ের অপারেশন সাকসেসফুল হয় বলে তাকে জানান। পরে চিকিৎসকরা তাকে অপারেশন-পরবর্তী ১২ সপ্তাহের থেরাপির সিদ্ধান্ত দেন।

কিন্তু সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির কর্মকর্তারা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তার পেছনে অনেক টাকা খরচের অজুহাত দেখিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের থেরাপির পর তাকে না জানিয়ে বিমানের টিকিট কেটে জোরপূর্বক দেশে পাঠিয়ে দেন।

বাংলাদেশে এসে সাবেক পিজি ও বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যাওয়ার পর সাধারণ রোগীর মতো তাকে চিকিৎসক দেখাতে হয়। চিকিৎসকরা তাকে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পায়ের ব্যায়াম করতে বলেন। নতুন করে তাকে কোনো চিকিৎসা দেয়নি। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, থেরাপি শেষে তার পায়ের ৬০-৭০ ভাগ সম্পূর্ণ চিকিৎসা হবে। কিন্তু বাংলাদেশের চিকিৎসকদের অবহেলা ও থেরাপি দিতে না পারায় তার পা ধীরে-ধীরে অকেজো হয়ে যাচ্ছে বলে জানান আজিম।

সিঙ্গাপুরে তার ফলোআপ চিকিৎসার বিষয়ে শহীদ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, বরাদ্ধ না থাকায় সরকারিভাবে ফলোআপ চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। বেশি সমস্যা হলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাকে চিকিৎসা করতে বলছেন। আজিমের বাবা একজন কৃষক।

আজিমদের গ্রামের বাড়িতে একটি টিনশেড ঘর রয়েছে। যে ঘরে আজিম, তার মা-বাবা ও বোনেরা শ্বশুরবাড়ি থেকে এলে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। আজিমদের সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। এদিকে, আজিমের দরিদ্র বাবার পক্ষে ছেলের উন্নত চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে আজিমকে তার পা হারোনোর আশঙ্কায় প্রতিনিয়ত দিন কাটাতে হচ্ছে।

আজিম বলেন, আমরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দিয়ে ফ্যাসিবাদ বিদায় করেছি। কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তরে বর্তমান সরকার ধীরে-ধীরে অনেকটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। সরকার জুলাই যোদ্ধাদের জন্য পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছেন। আমি চাই। আমার পরিবারকে যেন পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।