মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে সিলেটের তরুণরা, বিশ বছরে ৩ শতাধিক মৃত্যু

ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর সিলেটের তরুণরা। তাদের সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে মানবপাচারকারীরাও গড়ে তুলেছে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ।

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে সিলেটের তরুণরা, বিশ বছরে ৩ শতাধিক মৃত্যু
মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে সিলেটের তরুণরা, বিশ বছরে ৩ শতাধিক মৃত্যু |নয়া দিগন্ত

ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর সিলেটের তরুণরা। তাদের সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে মানবপাচারকারীরাও গড়ে তুলেছে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ।

স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে মানবপাচারকারীদের ভয়ঙ্কর ফাঁদ ‘গেম’ এ পা বাড়ায় শত শত তরুণ। সেই গেমে কেউ হেরে যায় ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কাছে। সেখানেই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে।

Untitled-18

সম্প্রতি সাগরপথে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে জীবন দিতে হয়েছে সুনামগঞ্জের ১২ তরুণ ও যুবকের। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর বেরিয়ে আসছে দালালদের ভয়ঙ্কর এ গেমের তথ্য।

সিলেট অঞ্চলের প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ২০০৯ সালে এভাবেই গ্রিস থেকে ইতালি পাড়ি দিতে গিয়ে ২১ জন তরুণ প্রাণ হারায়। সে সময় সেই ঘটনা দেশে বিদেশের গণমাধ্যমে আলোড়ন তোলে। ঠিক একইভাবে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা ও কুলাউড়া উপজেলার ৪ তরুণ ২০০৪ সালে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যান।

মৃতদের একজন বড়লেখা পৌরশহরের গাজিটেকা গ্রামের বজলুর রহমান তাপাদার। এদের কারো লাশই আর কোনো দিন পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০ বছরে সিলেট অঞ্চলের ৩ শতাধিক তরুণ ভূমধ্যসাগরে ডুবে চিরতরে হারিয়ে গেছে। তাদের জীবন্ত কিংবা মরা লাশই আর কোনো দিন পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধান বলছে, বেকারত্ব ও দারিদ্রতাকে পুঁজি করে একটি দালালগোষ্ঠি চড়া অংকের টাকা নিয়েও তরুণদের ঠেলে দেয় এই মৃত্যুর খেলায়। প্রবাসীবহুল সিলেট অঞ্চলের তরুণদের মধ্যে যে কোনোভাবে ইউরোপ যাওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে। তাদের অনেকে ঝুঁকি জেনেও ইউরোপ যেতে ‘গেম’-এর আশ্রয় নেন।

Untitled-19

তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগর হয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ প্রবেশের আগে অভিবাসীদের অপেক্ষা করতে হয় লিবিয়ার ত্রিপোলির উপকূলীয় এলাকার একটি ঘরে। সেই ঘরে চলে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার প্রশিক্ষণ। অনেক সময় চলে নির্যাতনও। এরপর ছোট নৌকায় করে ইউরোপের উদ্দেশে ছেড়ে দেয়া হয় সাগরে। মানব পাচারকারীরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার নাম দিয়েছে ‘গেম’। ইউরোপে পৌঁছাতে পারা না-পারায় নির্ধারণ হয় এই মরণ ‘গেম’-এর জয়-পরাজয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক তরুণ ইউরোপ যেতে এই ‘গেম’-এ চড়েন।

লিবিয়া থেকে ছোট নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ জন। গত শনিবার এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আবার আলোচনায় এসেছে ‘গেম’ এর বিষয়টি। সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সবাই তরুণ।

জানা গেছে, গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তারা। সাগরে পথ হারিয়ে ছয় দিন ছিলেন। অনাহারে তারা মারা যান। পরে সঙ্গীরা লাশ ভাসিয়ে দেন সাগরে। শুক্রবার গ্রিস উপকূল বোটে থাকা জীবিতদের উদ্ধার করে সে দেশের কোস্টগার্ড।

সাগরে মারা যাওয়াদের একজন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাঁওয়ের বাসিন্দা শায়েক আহমদ। বৃদ্ধ বাবা আখলুস মিয়া জমি বিক্রি করে টাকা তুলে দেন দালালদের হাতে। ৪ মাস শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, কুয়েত, দুবাই, মিশর, লিবিয়া নানা দেশে ঘুরানো হয় শায়েককে। অবশেষে ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ভূমাধ্যসাগর হয়ে গ্রিসে যাওয়ার জন্য নৌকায় তুলে দেয়া হয়। ২১ মার্চ এই ‘গেম’ হয় শায়েকদের।

তার আগে ২০ মার্চ তিনি কথা বলেন পরিবোরের সাথে। সেসময় টাকা দিয়ে হলেও তাকে ছাড়িয়ে নেয়ার আর্জি জানান।

ফোনে জানান, নির্যাতন করা হচ্ছে, অমানবিক পরিবেশে দিন কাটছে। বাবাকে অনুরোধ করেন, ২৩ মার্চের মধ্যে যদি নৌযানে রওনা দিতে না পারেন, তাহলে যেন তাকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

শায়েক আহমদের সাথে এসব আলাপের কিছুটা ফোনে রেকর্ড করে রাখেন তার পরিবারের সদস্যরা। এরকম একটি অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, শায়েক তার পরিবারের সদস্যদের বলছেন, ৫০, ৬০ বা ৭০ হাজার যত টাকা লাগে তাদেরকে দেও। দিয়ে আমাকে উদ্ধার করো। না হলে আমি বাঁচবো না।

নিহত শায়েখের বাবা আখলুস মিয়া বলেন, এই আলাপের পরদিনই ‘গেমে’ তুলে দেয়া হয় শায়েককে। এরপর আর তার সাথে যোগযোগ করা যায়নি। কালকে (শনিবার) মৃত্যুর খবর পেয়েছি। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, দলাল আমার ফুত নাইমরে সাগরো ফালাইয়া মারিলিছে। তোমরা তারে আইন্যা দেও। তোমরা দলালের বিচার করো।

গেম এর এই ভয়াবহতার কথা উঠে এসেছে নিহত অন্যদের পরিবারের সাথে আলা করেও। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যেতে ৭ থেকে ১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দালালদের দিয়েছেন একেকজন। তবুও ইউরোপ যাওয়া হয়নি তাদের।

দালালরা আটকে রেখে তাদের মারধর করেছে। খাবার দেয়নি। পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করতে দেয়নি।