৩১ বছর আগে সিলেটে লাখো কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় ‘খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ’

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে সিলেট বিভাগ হলো, বিভাগ হলো।’ তার সেই ঘোষণার সাথে সাথে লাখো কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, ‘খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ, খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ।’

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো

Location :

Sylhet
লাখো কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় ‘খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ’
লাখো কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় ‘খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ’ |নয়া দিগন্ত

১৯৯৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেটের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। এদিন সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে লাখো মানুষের সমাবেশে দুপুর ২টার দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে সিলেট বিভাগ হলো, বিভাগ হলো।’ তার সেই ঘোষণার সাথে সাথে লাখো কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, ‘খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ, খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ।’

সিলেট সার্কিট হাউসে সেদিন সকালে মন্ত্রী পরিষদের জরুরি বৈঠক বসে। অধিকাংশ সদস্য সিলেটে বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। কিন্তু প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এম সাইফুর রহমান সিলেট বিভাগ ঘোষণার পক্ষে অনড় ছিলেন।

এর আগে বিভাগের দাবিতে সিলেটে গণআন্দোলন গড়ে উঠে। ওই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। এর এক বছর পর ১৯৯৫ সালে সিলেট নগরের মিরবক্সটুলায় লায়ন শিশু হাসপাতাল উদ্বোধন করতে আসেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মন্ত্রী পরিষদের অধিকাংশ সিনিয়র সদস্য এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তারা প্রায় সবাই অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের প্রতি নানা রকম তীর্যক মন্তব্য ও অনুযোগ তোলেন। তারা তখন বলেছিলেন, অর্থমন্ত্রী সব টাকা সিলেটে নিয়ে আসছেন।

বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে কথা বলেন এম সাইফুর রহমান।

শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিলেটবাসীর পক্ষ নেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘এটা যেমন সাইফুর রহমান সাহেবের এলাকা তেমনি আমার বেয়াই এম এ খানের এলাকাও। সিলেট বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিয়েছে। এখন তাদের দেয়ার পালা।’

এরপর কেটে যায় অনেক দিন। ক্ষমতায় ভারতীয় তাবেদার আওয়ামী লীগ সরকার।

২০১৩ সালে সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে আবারো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়া দাঁড়ান বক্তব্য দিতে। সেইদিন তিনি সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেন। আওয়ামী লীগের নতজানু পররাষ্ট্র নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। খালেদা জিয়া তার বিখ্যাত একটি উক্তি করে বলেন, ‘আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির।’

২০০১ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন ও চারদলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেন সিলেট থেকে। পরে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিনি সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন।

দেশের তিনবারের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শেষ বারের মতো সিলেটে আসেন গ্রেফতারের আগে ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। সেদিন তিনি সিলেট হজরত শাহজালাল রহ:-এর মাজার জিয়ারত করেন। সেই সময় নেত্রীকে স্বাগত জানিয়েছিলেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। তাকে স্বাগত জানাতে তখন মাজার প্রাঙ্গণে নেতাকর্মীর ঢল নেমেছিল। তাদের মাঝে দেখা দেয় বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা। তাকে এক নজর দেখতে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় নগরের শত শত সাধারণ মানুষ ও দলের সমর্থকদের।

ওইদিন দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর দক্ষিণ সুরমার চণ্ডিপুল হয়ে সিলেট নগরে প্রবেশ করে। পরে বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর সিলেটে সার্কিট হাউজে পৌঁছায়।

খালেদা জিয়া হজরত শাহজালাল রহ:-এর মাজার জিয়ারত শেষে হজরত শাহপরান রহ:-এর মাজার জিয়ারত শেষে সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ ছেড়ে যান।

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে সিলেটের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে তার বার বার সিলেট সফরের কথা। রাস্তাঘাট ও দোকানপাটে খালেদা জিয়াকে নিয়ে নানারকম স্মৃতিচারণ করছেন অনেকেই।

সিলেটের প্রবীণ সাংবাদিক দৈনিক জালালাবাদের সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া সিলেটকে অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন। তাই তিনি এম সাইফুর রহমানের কোনো দাবি ফিরিয়ে দিতেন না। সিলেটবাসী নানা কারণে খালেদা জিয়ার কাছে ঋণী। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা বানিয়ে নিন এ দোয়া করি।’

বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের খবরে তার রুহের মাগফিরাত কামনায় সিলেটের বিভিন্ন মাদরাসায় খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

তার মৃত্যু সংবাদে বেদনা ভারাক্রান্ত মনে নগরবাসীর দিনের শুরু হয়। সিলেটের সব জায়গায় এখন আলোচ্য বিষয় বেগম জিয়া। বিশেষ করে বিভিন্ন সময় জীবন বাজি রেখে তার সাহসী উচ্চারণ ও আপসহীন সংগ্রামী ভূমিকার কথাই ঘুরেফিরে ছিলো আলোচনায়।

যেসব মাদরাসায় খতমে কোরআনের আয়োজন করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- হজরত শাহজালাল (রহ:) মাদরাসা, নয়াসড়ক মাদরাসা, কাজির বাজার মাদরাসা ও দারুস সালাম মাদরাসা।

সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাবেক প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদী নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে নগরবাসী শোকাভিভূত। আমরা নগরীর বিভিন্ন মাদরাসায় খতমে কোরআনের আয়োজন করেছি। মঙ্গলবার বাদ আসর দরগাহ-ই-হজরত শাহজালাল মসজিদ প্রাঙ্গণে সিলেট মহানগর বিএনপির উদ্যোগে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।’

তিনি জানান, ‘দোয়া মাহফিল শেষে সিলেট বিএনপির বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী জানাজায় অংশ নিতে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে সাধারণ ছুটির দিন বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সিলেট নগরের দোকান-পাট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।