ঘন কুয়াশার কারণে মেঘনা নদীতে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে নিহত ভোলার লালমোহন উপজেলার তিনজনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সরেজমিনে ভোলার লালমোহনে নিহতদের বাড়িতে গেলে নিহতের স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা যায়।
দুর্ঘটনায় নিহত লালমোহন উপজেলার তিনজন হলেন— বদরপুর ইউনিয়ন ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাদিরাবাদ বেপারী বাড়ির সেরাজল বেপারীর ছেলে রাজমিস্ত্রি আব্দুল গনি (৩৮), একই এলাকার গোলাপ খাঁ বাড়ির কালু খাঁয়ের ছেলে মো: সাজু (৪৫) এবং পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড লালমিয়া গাজী বাড়ির মো: হোসেনের স্ত্রী মোসা: রিনা (৩৫)।
সরেজমিনে গিয়ে বদরপুর ইউনিয়ন ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাদিরাবাদ এলাকার নিহত আব্দুল গনির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী লাইজু বেগম ও আত্মীয়-স্বজনরা আহাজারি করছেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে চিৎকার করে লাইজু বেগম বলছেন, তার তিন সন্তানের কি হবে?
লাইজু বেগম বলেন, ‘আমি কালকে তাকে ঢাকা যেতে বারবার নিষেধ করেছি। কাজের কারণে সে কালকেই ঢাকা চলে গেছে। রাতেই মৃত্যুর সংবাদ শুনতে পাই।’
অন্যদিকে, পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নের কচুয়াখালী গ্রামের লাল মিয়া গাজি বাড়ির গার্মেন্টসকর্মী রিনা বেগমের বাড়িতেও চলছে আহাজারি। তার স্বামী মো: হোসেন ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করত। ৭-৮ বছর আগে নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের জন্য স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে যায় রিনা বেগম।
তাদের একমাত্র মেয়ে সাথী বাড়িতে দাদা-দাদির কাছে থাকত। স্থানীয় কচুয়াখালী মহিলা মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সাথী মায়ের করুণ মৃত্যুর খবর শুনে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিকেলে বাবা-মা একসাথে মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লঞ্চে ওঠে কচুয়াখালী ঘাট থেকে। যাবার বেলায় তারা বলে যান, রোজার ঈদে আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই রাতেই শুনতে পান মায়ের মৃত্যু সংবাদ। বাবাও গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছেন।
এর আগে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা ও হরিণা এলাকার মাঝামাঝি স্থানে মেঘনা নদীতে এমভি জাকির সম্রাট-৩ ও এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই একজনসহ মোট চারজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হন অন্তত ১৫ জন যাত্রী।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) এ তথ্য নিশ্চিত করেন নৌ-পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের এসপি সৈয়দ মুশফিকুর রহমান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও যাত্রীদের বরাতে জানা যায়, ঘন কুয়াশার কারণে অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের মাঝ বরাবর সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটির দ্বিতীয় তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিহত নারী যাত্রী সংঘর্ষের মুহূর্তে মর্মান্তিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। অপর তিন পুরুষ যাত্রীও গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
যাত্রীরা জানান, রাতে লঞ্চের সাইডে অনেক যাত্রী ঘুমিয়ে ছিলেন। সংঘর্ষের তীব্রতায় বহু যাত্রী নদীতে পড়ে যান। তাদের মধ্যে কয়েকজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার কাজ চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতদের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। স্থানীয় জেলে ও নৌযান শ্রমিকদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর মাঝনদীতে ক্ষতিগ্রস্ত জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি ডুবো-ডুবো অবস্থায় ভাসতে থাকলে ভোলা থেকে ঢাকাগামী এমভি কর্ণফুলী-৯ লঞ্চ দ্রুত এগিয়ে এসে অনেক যাত্রীকে উদ্ধার করে ঢাকার উদ্দেশে চলে যায়।
ঘটনার পরপরই নৌ-পুলিশ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।
লালমোহন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: অলিউল ইসলাম জানান, ঘটনাটি আমরা জেনেছি। ঘটনাস্থল লালমোহন এলাকায় হয়নি তবুও ভুক্তভোগী পরিবার সহায়তা চাইলে যথাযথ সহায়তা দেয়া হবে। এছাড়া নিহতদের লাশ এলাকায় এলে আমাদের ফোর্স সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে।



